বাংলার জামদানি

আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টাব্দের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে বঙ্গ ও পুণ্ড্র এলাকার সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লে­খ আছে, যার মধ্যে ছিল ক্ষৌম, দুকূল, পত্রোর্ণ ও কার্পাসি এবং পেরিপ­াস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি বইতেও আরব, চীন, ইতালির পর্যটক, ব্যবসায়ীর বর্ণনাতে এটা সপষ্ট—বাংলাদেশের গৌরবময় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ জামদানি।

হালে জামদানি নানা স্থানে তৈরি করা হয় বটে, কিন্তু ঢাকাই জামদানির আদি জন্মস্থান। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীদের অতি পরিচিত। মস-লিনের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। জামদানি বয়নের অতুলনীয় পদ্ধতি ইউনেস্কো কর্তৃক একটি অনন্যসাধারণ ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেইজ হিসেবে স্বীকৃত। ঐতিহাসিক বর্ণনা, শ্লে­াক প্রভৃতি থেকে প্রতীয়মান হয় যে দুকূল বস্ত্র থেকে মসলিন এবং মসলিনে নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হতো। মূলত বাংলাদেশের ঢাকা জেলাতেই মসলিন চরম উত্কর্ষ লাভ করে। ঢাকা জেলার সোনারগাঁও, ধামরাই, তিতাবাড়ি, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ি প্রভৃতি এলাকা মসলিনের জন্য সুবিখ্যাত ছিল। ইউরোপীয়, ইরানি, আর্মেনিয়ান, মুগল, পাঠান বণিকেরা মসলিন ও জামদানি ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ২৩টি চুক্তির একটি বাণিজ্যসমপর্কিত মেধাস্বত্ব চুক্তি (ট্রিপস)। এই চুক্তির ২৭.৩(খ) ধারায় পেটেন্ট করার বৈধ অধিকার রাখা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব প্রাকৃতিক মানুষের তৈরি, কৃষিজাতপণ্য দীর্ঘকাল ধরে উত্পাদিত হয়ে আসছে, তার ওপর সংশ্লি­ষ্ট দেশের মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য ভৌগোলিক নিদের্শক আইন করে নিবন্ধন করার বিধান রাখা হয়েছে। ভারত সরকার ১৯৯৯ সালেই আইনটি করে ফেলে। বাংলাদেশে ২০০৯ সালে আইনের খসড়া করা হলেও আইনটি পাস হয়নি। তবে ভারতের এ উদ্যোগের কারণে সংসদে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর আইনটি পাস হয়। বাংলাদেশের প্রতিবাদের কারণে বর্তমানে ভারতের কালনা ও উপাধা জামদানির নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। জামদানি একান্তই বাংলাদেশের। জামদানি এ দেশের অধিকার। বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের নাম জামদানি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*