বাংলাদেশে পথ শিশুদের অবহেলিত জীবন

 


হাসান মুকুল :: আমাদের সকলের প্রাণের স্পন্দন বাংলাদেশ। যে দেশের মানব সম্পদ এবং মেধা সম্পদ দিয়ে অন্যান্য দেশ আজ সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুসজ্জিত। অপরদিকে আমরা আজীবন গরীব দুঃখীই থেকে গেলাম। অথচ আমরা সারা জীবন শুধু অন্যদের প্রতিষ্ঠার গান শুনি,অনেক বেশী মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে নিজেদের উন্নতির কথাই ভুলে যায়। পরিপূর্ণ ভাবে ভুলে যায় কি করা উচিৎ ছিলো আর কি করছি! যার চূড়ান্ত কু-ফল আমাদেরকে চাক্ষুষ দেখতে হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান সমস্যার মধ্যে শিশু শ্রম শনির দশা পরিগ্রহ করছে। শিশু পূর্ণার্ঙ্গ মানুষ থেকে কিছুটা আলাদা। এটা বোঝাতে গেলে হয় বোকা সাজতে হবে নইলে অন্যকে বোঝাতে ব্যর্থ হতে হবে। শিশু শ্রম নিয়ে অনেক আইন আছে সুপ্রিম কোর্টের বড় বড় বইয়ের পাতায়। কিন্তু কার্যকরের বেলায় আইন থাকে শূন্যের কোটায় যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিক শিশুরা করে মানবেতর জীবন যাপন আর থাকে বস্তিতে ।
ঢাকা শহরের অতি পরিচিত দৃশ্য হচ্ছে,বস্তা হাতে টোকাই বা পথ শিশুদের বিচরন। মূলতঃ রাস্তায় যত্রতত্র পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট বস্তু গুলো কুড়ানোই এদের মূল কাজ। প্রায়শই খালি গায়ে কিংবা ছেড়া ময়লাযুক্ত জামাকাপড় পরে ঘুরে বেড়ায় এই সব শিশুরা। নিছক জীবিকা বা বাবা মাকে বেঁচে থাকার রসদ যোগানোর জন্য কাঁচা বয়সে তাদের এই রকম জীবন যাপন।

রাস্তার সিগন্যাল, ফুটপাথ, রেলওয়ে ষ্টেশন বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় পথ শিশুরা ফুল বিক্রি করছে। তাদের কাছ থেকে আমরা ১০ টাকা দিয়েও ফুল কিনতে চায় না। অথচ ফুল বিক্রি করার ঐ সব মুহুর্তগুলির যেসব ছবি ফটোগ্রাফার’রা তোলে, সেটা নিয়ে প্রদর্শনী/ এক্সিবিশন হয় এবং আমরা সেগুলো বেশ টাকা খরচ করে দেখি এবং কিনেও আনি! মাঝে মাঝে ফটোগ্রাফার’রা পুরষ্কৃত হন কিন্তু পথের শিশুরা পথেই রয়ে যায়। অপরদিকে, সোশ্যাল মিডিয়াতে এসব ছবি শেয়ার করে লাইক শেয়ার ইত্যাদি ভিক্ষা চাওয়া হয়। অনেকে খুব কষ্ট পেয়েছেন বলে মন্তব্যও করে থাকেন। কিন্তু তাতে কি পথ শিশুদের কোন লাভ হচ্ছে? তাদের যাপিত জীবন আগেও কষ্টের মধ্যে ছিলো এখনো আছে।

মানুষ হিসেবে আমরা অনেক বেশী আবেগপ্রবণ। কিন্তু কথায় আছে, আবেগ দিয়ে ভালোবাসা হয় জীবন চলে না। পথশিশুদের জীবনেও হয়তো ভালোবাসা আছে কিন্তু জীবন চলছে তিমিরাবগুণ্ঠিত ভাবে। যে বয়সে শিশুর স্কুলে যাওয়ার কথা, বিভিন্ন খেলা করে হাসি আনন্দে বেড়ে ওঠার কথা। অথচ সে বয়স থেকেই শিশুকে ধরতে হচ্ছে সংসারের হাল। মোটর, রিকশা, সাইকেল নির্মাণ বিদ্যুৎ ইটভাটা, চা ষ্টল,হোটেল,রেষ্টুরেন্টে, রাজমিস্ত্রীর সাহায্যকারী, ওয়েলডিং কারখানায়, গার্মেন্টস,জুটমিল,কৃষিসহ বিভিন্ন কাজে শিশুরা জীবন জীবিকার পথ খোঁজে। অনেকেই ট্যাক্সি, ম্যাক্সি, টেম্পু,মাইক্রোবাসের হেলপার,কেউবা চালাচ্ছে রিক্সা,কেউ কাঠমিস্ত্রির সহকারী। অভাবের তাড়নায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে শিশুরা। জলন্ত কয়লার লেলিহান আগুনের শিখা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছে শিশুরা। এতে ওদের শারীরিক, মস্তিস্ক গঠনেও বাঁধা সৃষ্টি হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার ফলে ওদের জীবনে অনেক দূর্ঘটনা ঘটে। ফলে কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এসব শিশুরা,অনেক সময় পঙ্গুত্ব বরণ করে, জীবনী শক্তি ক্ষয়ে অনেক শিশু মারাও যাচ্ছে। দেশের সরকার এবং সচেতন নাগরিকগণ এ ব্যপারে নির্বাক থাকছেন। অথচ তাদের একটু সহানুভূতিই বদলে দিতে পারতো এসব শিশু শ্রমিকদের জীবন।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে এসব শিশু পিতৃ কিংবা মাতৃহীন , মা তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বাবা মারত্মক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, মাদকাসক্ত কিংবা তারা কর্মহীন থাকতে বেশি পছন্দ করেন। অর্থ উপার্জনের ভার এসে বর্তায় তাদের উপর। সংসারের হাল ধরতেই শিশুরা বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হচ্ছে। শিশু শ্রমিকদের বয়স ১০ থেকে ১৪/১৫ বছর। সেই ভোর থেকে কাজ শুরু হয়ে রাতের অনেকটা সময় জুড়ে ওরা কাজ করে। একটু ভুল হলেই মালিকের হাতে মার খেতে হয় । কখনও কখনও তাকে চাকুরী হারাতে হয়। সারা দিনে কাজের ধরন বুঝে ২/৩ বেলা খাবার পায় এই শিশু শ্রমিকেরা। দিন শেষে ২০ থেকে ৫০/৬০ টাকা কিংবা মাস শেষে ৫০০/৬০০ টাকা পেয়ে থাকে। যা তাদের শ্রম এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য। মালিক পক্ষের কাছে কোন দাবি তুললেই চাকুরিচ্যুত হতে হয়। এভাবেই চলছে তাদের যাপিত কষ্টময় জীবন।
অনেক সময় চোখে পড়ে এসব পথ শিশুরা ভিক্ষাবৃত্তির সাথেও জড়িয়ে গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের কে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য করা হয়। একটা দুষ্টু চক্র খুবই সক্রিয় ভাবে কাজ করে যাচ্ছে এই শিশুদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেবার। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকাতে এসব মহল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও তারা স্ব-অবস্থানেই থেকে যাচ্ছে। কথিত আছে, এসব শিশুদেরকে ভিক্ষাবৃত্তির উপযোগী বানানোর জন্যে হাত-পা ভেঙ্গে বা খোড়া করে দেওয়া হয়। চোখ উপড়ে ফেলতেও তারা দ্বিধা করেনা! অথচ আমরা সব জেনেও না জানার ভান করে বসে থাকি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক সমীক্ষায় দেখা যায়,বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬৫ লক্ষ (৬.৬ মিলিয়ন) যা পৃথিবীর মোট শিশু শ্রমিকের ২.৬ অংশ। আমাদের মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশই শিশু,যাদের বয়স ষোল বছরের কম। সমীক্ষায় দেখা যায়,এদের প্রতি ১০০ জনে ১৯ জন শিশু শ্রমিক। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী,২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের রাস্তায় শিশুর সংখ্যা ১১ লাখ ৪৪ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
আমাদের সংবিধানে প্রত্যেকটি মানুষের মৌলিক অধিকার দেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা ব্যস্ত আছেন নিজের মৌলিক চাহিদাকে পূরণ করার নিমিত্বে। শুধু তাদের মৌলিক চাহিদা বললে বড্ড ভুল হবে, বলা উচিৎ তাদের আগামী চৌদ্দ পুরুষ যেন মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত না হন সে লক্ষ্যে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন। আর যাদের মৌলিক অধিকারগুলো পাওয়ার কথা ছিলো তারাই হচ্ছেন মূলত উপেক্ষিত। কথায় আছে ‘অভাগা যেদিকে চায়, সেদিকেই সাগর শুকিয়ে যায়’। পথশিশু তথা সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের রক্ষায় কিছু সংস্থা কাজ করলেও উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন চোখে পড়ে না। বিত্তশালীরা সচেতন হয়ে একটি-দুটি করে শিশুর দায়িত্ব নিলেও সেটা তাদের স্বদিচ্ছার ব্যাপার,না করলেও কেউ কারো বলতে বা বাধ্য করাতে পারেনা।
প্রতিবছর ১২ জুন বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে পালিত হয় শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস। আনুষ্ঠানিক ভাবে একটা দিবস ঠিকই পালন হয়ে যায়। কিন্তু ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে শিশু শ্রমে বাধ্য করা মহলটি। কেউ নিশ্চিত করতে পারছে না সেই মহলের শাস্তি। সরকারের পাশাপাশি আমরা যদি এই দায়িত্বটা ভাগ করে নিতে পারি তাহলে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেই আমার বিশ্বাস। আর পরিপূর্ণ সুবিধা এই পথ শিশুদেরকে দিতে পারলে তারা দেশের বোঝা হওয়ার পরিবর্তে হয়ে উঠবে আমাদের দেশের মানব সম্পদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*