এ ভাষণটি যেভাবে সারা বিশ্বের হলো

২০১৮ সালের ৭ মার্চ অনন্য তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। বাঙালি জাতির স্মৃতিতে মহিমান্বিতভাবে খোদিত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে দেওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি যে বিশ্বমানবের স্মৃতির অংশ, সে স্বীকৃতি মিলেছে ইউনেসকোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে সেটির অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে। এই স্বীকৃতির পেছনে যে প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতি ছিল, তার কিছু বিষয় আজ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া যেতে পারে। স্বীকৃতির তাৎপর্য অনুধাবনে তা সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে। ১৯৯২ সালে ইউনেসকো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার কর্মসূচি প্রবর্তন করেছিল এই বার্তা দিতে যে বিশ্বের গুরুত্ববহ প্রামাণিক ঐতিহ্য সর্বজনের সম্পদ; সবার জন্য তা সংরক্ষিত হওয়া দরকার। ইউনেসকোর ভাষায় এই রেজিস্টার হবে অনন্যসাধারণ মূল্য ও বিশ্বজনীন তাৎপর্যসম্পন্ন প্রামাণিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে সম্মানজনক তালিকা।

২০১৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিধিসম্মতভাবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রেজিস্টারভুক্ত করার আবেদন ইউনেসকোতে পেশ করা হয়। আবেদনকারী ছিলেন সরকারের পক্ষ থেকে ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষে ট্রাস্টি মফিদুল হক। আমাদের উভয়ের ক্ষেত্রে এই আবেদন পেশের পূর্ববৃত্তান্ত রয়েছে। ২০১৩ সালে ইউনেসকো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে আবেদন পেশের পদ্ধতি বিষয়ে কম্বোডিয়ায় এক কর্মশালার আয়োজন করেছিল। বাংলাদেশের ইউনেসকো জাতীয় কমিশন আমাকে সেই কর্মশালায় যোগদানের জন্য মনোনীত করে। ইউনেসকো দীর্ঘ এক আবেদনপত্র পাঠায় পূরণ করে আয়োজিত কর্মশালায় নিয়ে আসার জন্য। নানা যুক্তি-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহকারে ৭ মার্চের ভাষণভুক্তির ফরম পূরণ করে পাঠানো হলেও অনিবার্য কারণে সেই কর্মশালায় যোগদানের সুযোগ আমার হয়নি।

তারপর অনেক সময় পার হয়ে গেলেও জীবনের ধন কিছুই বুঝি অপাঙ্ক্তেয় হয় না। ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম ফোন করে জানালেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে তিনি মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্তির আবেদন পেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমার আগে পূরণ করা ফরমটি তিনি পেতে চান। এরপর চলে তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ও মতবিনিময়। আমরা একযোগে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আবেদনপত্র জমা দিই ইউনেসকো দপ্তরে। শুরু হয় অপেক্ষার পালা, নীরবে-নিভৃতে কাল গণনা। বছরান্তে পাওয়া গেল অনুকূল খবর। প্রাথমিক বাছাইপর্বে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিবেচনার জন্য অনুমোদিত হয়েছে। তবে সে খবর গোপন রাখার পরামর্শ দেয় ইউনেসকো। কিছু বিষয় বর্জন এবং কিছু বিষয় সংযোজনের সুপারিশও করে তারা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিটির সভার সময়টুকু ছিল উত্তেজনাময়। সেই সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউনেসকোর সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে মহাসচিব ২০১৭ সালের মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডের তালিকা পাঠ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লাভ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণের জাতীয় তাৎপর্য আমাদের জন্য ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না। তবে ইউনেসকোর কাছে বিশেষভাবে তুলে ধরা দরকার ছিল এর বিশ্বজনীন তাৎপর্য। ইউনেসকোর দিক থেকে প্রশ্ন ছিল, আবেদনকৃত ঐতিহ্য অনন্য ও বিকল্পহীন কি না? এটা কি দীর্ঘকাল জুড়ে কিংবা বিশ্বের কোনো বিশেষ সাংস্কৃতিক এলাকায় প্রভাব সঞ্চার করেছে? ইতিহাসকে তা প্রভাবিত করেছে কি? ইত্যাদি ইত্যাদি।

তুলনামূলক বিচারে তিনটি দিকে জোর দেয় ইউনেসকো—সময়, স্থান ও জনগণ। এর অন্তত একটি ক্ষেত্রে ইউনেসকো নির্ধারিত মাপকাঠি পূরণ করতে হবে আবেদনকৃত ঐতিহ্যের। এসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ ১৭ পৃষ্ঠার আবেদনপত্র পূরণ করতে হয়েছিল আমাদের। ৭ মার্চের ভাষণের কালিক ও স্থানিক বিচারে পাকিস্তানের পীড়ন-শোষণের বিপরীতে বাঙালির জাগরণের ইতিহাস ও পটভূমির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। বৃহত্তর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চের ভাষণ বিচারকালে তৃতীয় বিশ্বের ঔপনিবেশিক দেশের মুক্তি আন্দোলনের নিরিখে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও ভাষণের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক দেশসমূহ একে একে স্বাধীনতা অর্জন করলেও সেসব রাষ্ট্রে নানা অসংগতি বিরাজ করছিল। জনগোষ্ঠীর জাতিগত, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ধারণ করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও অসংগতি মোচনে নতুন পথ দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো ব্যত্যয় যখন বিশ্বসম্প্রদায় অনুমোদন করেনি, সেই সময়ে প্রথম যৌক্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। এর তাৎপর্য অপরিসীম। বিচ্ছিন্ন হলেও তাঁর আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিল না, ছিল জাতীয় মুক্তির আন্দোলন; জাতি, ধর্ম, ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ও অধিকারের প্রতি মান্যতার ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রের প্রবর্তন। এই আন্দোলনের উত্তুঙ্গ নাটকীয় মুহূর্ত ছিল ৭ মার্চ, যখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শেখ মুজিব বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে কার্যত স্বাধীনভাবে পথচলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল অস্ট্রেলীয় অধ্যাপক হারবার্ট ফেইথের উক্তি, ‘৭ মার্চ ছিল সেই দিন, যখন মানসপটের রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।’

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-উত্তর বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থার মানচিত্র অলঙ্ঘনীয় হবে, এটাই সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছিল। এর জের হিসেবে আমরা দেখি প্রথম মহাযুদ্ধের পর ইউরোপের রাজ্যভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বদলে প্রতিষ্ঠা পায় জাতিরাষ্ট্র, মানচিত্রের অসংগতি অনেকাংশে দূর করে। অন্যদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক দেশগুলো একে একে স্বাধীনতা অর্জন করলেও মানচিত্রে রয়ে যায় ঔপনিবেশিক অসংগতি। জাতীয় মুক্তির অধিকারের পতাকা হাতে ঔপনিবেশিক অসংগতি দূর করে নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই তিনি কেবল জাতীয় আন্দোলনের নেতা ছিলেন না, ছিলেন তৃতীয় বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনে এক বিশিষ্ট ধারার উদ্গাতা। ইউনেসকো তার স্বীকৃতিপত্রে উল্লেখ করেছে যে উপনিবেশ-উত্তর জাতিরাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থতার নিরিখে এই ভাষণ কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে।

বিশ্বমানবের মুক্তিসংগ্রামের নিরিখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বিবেচনায় নিয়েছিল ইউনেসকো। উদার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ করে দিয়েছিল ৭ মার্চের ভাষণ। সেই মূল্যবোধ আজকের সংঘাতপীড়িত বিশ্বে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইউনেসকো তাই কেবল বাঙালি ঐতিহ্য হিসেবে নয়, বিশ্বমানবের সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ৭ মার্চের ভাষণকে। এই বড় পটভূমিকায় ৭ মার্চের ভাষণ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব উপলব্ধি করার এবং বিশ্বের সামনে তা মেলে ধরার দায়ভার এখন আমাদের ওপর বর্তেছে। কেননা, বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলাদেশের নেতা ও স্থপতি ছিলেন না, তিনি মানবের মুক্তি আন্দোলনেরও প্রেরণা, বিশ্বলোকের স্মৃতির অংশী।
মফিদুল হক: ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*