চট্টগ্রাম ছাড়ছে মানুষ


জিএসএস নিউজ ::  স্বজনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম নগরীতে বসবাসকারীরা। সড়ক পথে ভোগান্তির কথা বিবেচনা করেই ট্রেন যাত্রাকেই নিরাপদ বলে মনে করছেন অনেকেই।
কেউবা ট্রেনের ছাদে, আবার অনেকে রয়েছে টিকিট নিয়েও দাঁড়িয়ে, সরেজমিনে এমন দূর্ভোগ দেখা গেলেও হাসি মুখে বাড়ি ফিরছেন ঘরমুখো মানুষরা। এদিকে টিকিট কাটলেও আসন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে কিছু কিছু যাত্রীদের মাঝে।
চট্টগ্রাম রেলস্টেশন ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, আজ সঠিক সময়ে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে গেছে অনেক ট্রেন। তবে আগামীতে শিডিউল বিপর্যয় যেন না হয়, সেদিকে নজর রেখেছে রেলকর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে বাসে যাত্রীদের তেমন ভীড় দেখা না মিললেও বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগসহ সঠিক সময়ে বাস না ছাড়ার অভিযোগ রয়েছে।
নগরীর বিআরটিসি বাসটার্মিনাল এলাকা, অলংকার মোড়, ইপিজেড মোড়, স্টিল মিল বাজার, স্টেশন রোড ও বায়েজিদ এলাকা থেকে ছেড়ে যায় দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস। এসব বাসের টিকিট অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গেছে।
কিন্তু সড়ক মহাসড়কে যানজটের কারণে সিডিউল ভেঙ্গে পড়েছে। কোন বাস নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যেতে পারছে না। যাত্রীদের ঘন্টার পর ঘন্টা কাউন্টারে বসে থাকতে হচ্ছে। এতে করে দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা।

গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে মা-মেয়ের ট্রেনযাত্রা। ছবিটি বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে তোলা
সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, ভাঙা রাস্তাঘাট, অসহনীয় যানজট, অজ্ঞান পার্টি দৌরাত্ম্য- এমন নানা ভোগান্তিতে নাকাল মানুষ। এসব ভোগান্তি সঙ্গী করে ছুটছে মানুষ নাড়ির টানে, বাড়ির পানে। আপনজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে যে যেভাবে পারছেন প্রিয় মাটিতে ফিরছেন।

ঈদের আগে আজ বৃহস্পতিবার শেষ কার্যদিবস হলেও গতকাল শবে-কদরের ছুটি থাকায় ‘অঘোষিত’ ঈদের ছুটি শুরু হয় বুধবার থেকেই। ফলে ওইদিন থেকেই চট্টগ্রাম সিটি ছাড়তে শুরু করে মানুষ। বৃহস্পতিবার বৃষ্টি ও খারাপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে সকাল থেকেই মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে কদমতলি, বহদ্দারহাট, অলঙ্কার ও অক্সিজেনসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাস কাউন্টারগুলোয়।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টি উপেক্ষা করেই হাজার হাজার মানুষ টার্মিনালে ছুটে এসেছেন। আগামীকাল শুক্রবার, তাই আজ সকাল থেকে যাত্রী উপস্থিতি হঠাৎ বেড়ে যায় বলে জানান এস আলম পরিবহনের কাউন্টারের কর্মী জহিরুল।
কক্সবাজার যাবেন কলেজ শিক্ষার্থী রিদওয়ানু। তিনি বলেন, ‘কলেজ আগে বন্ধ হলেও দুটো টিউশনি ছিল, তাই থেকে গিয়েছিলাম। বেতন পেয়ে নিজের ও পরিবারের জন্য ঈদবাজার সেরে আজ বাড়ি যাচ্ছি। সন্ধ্যার আগে পোঁছাতে চাই, তাই আগেভাগে বের হওয়া। যাতে বাসায় গিয়ে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা দেখতে পারি।’

চকরিয়ায় যাবেন সরকারি কর্মকর্তা লতিফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটি ছুটি নিয়ে রেখেছিলোম আগেই। গতকাল ঈদবাজার শেষ করে আজ বাড়ি যাচ্ছি। খবর নিয়ে জানলাম গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সেখানকার রাস্তাঘাট সব ভেঙে একাকার হয়ে গেছে। তাছাড়া মাতামুহুরী নদী হয়ে পুরো এলাকা পাহাড়ি ঢলের পানিতে সয়লাব। জানি না কখন বাড়ি পৌঁছাব।’

শিরিন নামে এক নারী অভিযোগ করেন, টার্মিনালের ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ। প্রবেশপথে কাদা জমে আছে। ওয়েটিং রুমের পরিবেশ ভালো না। টয়লেট থেকে অনবরত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে কুলি ও হকারদের উৎপাত। যাত্রী দেখলেই কুলিরা ছুটে গিয়ে যাত্রীদের লাগেজ নিয়ে টানাটানি করে। লাগেজ বহনের নামে কুলিরা আদায় করছে মোটা অঙ্কের টাকা। এ টাকা না দিলে যাত্রীদের হয়রানি করা হয়।

নগরের কদমতলী বাস টার্মিনাল। চট্টগ্রামের এই বাস টার্মিনাল থেকে বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী ও দক্ষিণবঙ্গের ১৬টি রুটের গাড়ি ছেড়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে কথা হয় চট্টগ্রাম-চাটখিল (নোয়াখালী) রুটের বাসযাত্রী রাশেদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি নগরের লালখান বাজারের একটি ওষুধের দোকানে চাকরি করেন। যাবেন চাটখিল। ভাড়া কত নিয়েছে জিজ্ঞেস করতেই তার কথায় ক্ষোভ ঝরে পড়ে। রাশেদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে চাটখিলের ভাড়া ২৭০-২৮০ টাকা। অথচ টিকিট কেটেছি ৩৫০ টাকায়।’

অবশ্য কদমতলী বাস টার্মিনালের পাশেই স্টেশন রোড। এখানের বিআরটিসির ঢাকাগামী ননএসি ও উত্তরবঙ্গের দূরপাল্লার বাসগুলো নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই চলছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে গিয়েও খুব বেশি যাত্রীর দেখা পাওয়া গেল না। ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা ঈদে বাড়ি ফিরতে পারছেন।

ইউনিক পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা জয়নাল বলেন, ‘ঢাকা ছাড়া অধিকাংশ জায়গার টিকিট অনেক আগেই বিক্রি হয়েছে। এবার মহাসড়কেও যানজটের তেমন কোনো ভোগান্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবু বৃষ্টির কারণে কাউন্টারে উল্লেখযোগ্য কোনো ভিড় চোখে পড়ছে না। সবসময়ের মতোই বাস চলছে। বলার মতো কোনো ভিড় এখনো চোখে পড়েনি।’

নগরের দামপাড়া থেকে ছেড়ে যায় চট্টগ্রাম-ঢাকা ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের এসি বাসগুলো। নির্দিষ্ট সূচি মেনেই এখান থেকে বাস ছাড়ছে বলে কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল। দামপাড়া গ্রিনলাইন কাউন্টারের বিক্রয় কর্মকর্তা মাহবুবুর জাগো নিউজকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে তারা চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে দিনে ১২ ট্রিপ (যাওয়া-আসা) চালাচ্ছেন। মহাসড়কের মেঘনা ও গোমতী সেতু এলাকায় যানজট হলেও সূচি মেনেই তাদের গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে।

এদিকে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, চাঁদপুরসহ কয়েকটি জেলার যাত্রীরা ট্রেনে গাদাগাদি করে উঠেছেন। অসংখ্য যাত্রীকে ট্রেনের ছাদে দেখা গেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা বাড়ি ফিরছেন। ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত বগি সংযোজন করা হয়েছে।
কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৫ জুন যারা অগ্রীম টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন তারাই বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরছেন। গত ১০ জুন থেকে ঈদযাত্রা শুরু হয়। সেই হিসেবে বৃহস্পতিবার পঞ্চম দিনের মতো ট্রেনযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাচ্ছেন ঘরমুখো মানুষ।
চট্টগ্রাম রেল স্টেশন এলাকা থেকে ‘অজ্ঞান পার্টির’ চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবুল কালাম আজাদ জানান, ট্রেনে ঘরমুখো যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিটি ট্রেন শিডিউল অনুযায়ী ছাড়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখনো কোনো ধরনের ঝামেলা হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*