Home / শিল্প-সাহিত্য / ন্যাপথলিন

ন্যাপথলিন

তাহমিনা আক্তার : ন্যাপথলিন খুঁজি খুঁজি আজো খুঁজে ফিরি স্মৃতির আনাচে কানাচে একটি নিবিড় মমতাময়ী সুগন্ধীযুক্ত ছোট্ট একটা টিনের ট্রাঙ্ক জাতীয় বাক্সপেট্‌রা। যেখানে মায়ের সকল মমতাগুলো ভাঁজে ভাঁজে লুকানো, আর সকল ভাঁজের ভেতর একটি কোমল নরোম তুলতুলে ন্যাপথলিনের সুগন্ধ… যেন ওটা খুলে দিলেই তা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে সবকিছুতে সুরভী মেখে দেবে। সেকালে মায়েদের কি তেমন নিজস্ব কিছু ছিল..??? ছিল না, ছিল না -নিজস্ব কিছুই ছিল না! নিজস্ব বলতে আগলে রাখা একটি সুন্দর সুঠাম স্বামীর সংসার, শ্বশুরের ভিটে, সন্তান…। ছিল না তার অবসর। ছিল না তার ক্লান্তি। ছিল সুঠাম সংসারের সকল আনাজপাতির সাথে মায়ের নিবিড় গভীর সখ্যতা।আমার মা’কে কখনো তেমন সাজ সজ্জায় দেখিনি, দেখিনি ঠোঁটে কোন মেকী রঙ। পানের রসের রসালো রঙেই মায়ের ঠোঁটটা টুকটুকে লাল দেখাতো… চুলের বিনুনিও চোখে পড়েনি। খোঁপায় খোঁপায় ফুটন্ত খই হয়ে ফুটে থাকতেন আমাদের মমতাময়ী মা জননীরা। মায়ের দুটো হাত ছিল তামাটে রঙের কংকণ পরা সে কংকণ ছিল আগুনের তাপে তাপে তার উজ্জলতা হারানো কখনো বা বাঁকানো মোড়ানো কিছুটা জং ধরা। কখনো কানে দুল না থাকলেও কখনো নাকের ফুল নাই হয়ে যায়নি। নাক ফুলে সেজে নাককে সযত্নে রাখতেন। এ যেন বাঙালি মায়েদের নাক ফুলের প্রতি এক ফুলেল অন্ধ বিশ্বাস। নাকফুল নিয়ে নাষিক্য সজ্জায় স্বামীর কল্যানীয়া দূতাবাস এহেন সময়েও এসে যখন মাকে এক গালে ঢেপে দেয়া পানমুখো অবয়বে কি রোমাঞ্চকর মনে হয় মায়ের মুখ… মাগো একি অপরূপ সুদৃশ্য দেখাও তুমি তোমার বাছারে ?? মায়ের মমতার আঁচল হৃদকম্পমান ধুক ধুক করে কেঁপেই চলে। টের পাই মা সমুদয় বরকতের ঝুঁড়ি সেতো তোমারই কল্যাণে! আজো যখন সেই ছোট্ট বেলার সুদূর অতীতের স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠে, স্পস্ট দেখতে পাই মায়ের টুকটুকে লালচে ঠোঁটের গহবরে এক সুবিশাল মমতা রেখা মায়ের না য়ের ঝুড়িতে ছিল, না পাওয়ার বিশাল ভাণ্ডার। সকল গৃহস্থালী আনাজপাতির ভীড়ে মায়ের ছিল না নিজস্ব কোন সেল্ফ-আলমারী। শুধু একটা আগোছালো আলনা ছাড়া ছিল না তার টুকিটাকি জিনিসপত্র রাখার কোন স্থান।

সব কিছুর পরেও মায়েদের অনেক কিছু থাকে যা জগতের আর কারো কাছেই থাকে না। মায়ের ছিল অবারিত শাসনের এক অমুল্য সম্পদ। আর ছিল ছোট্ট একটা ছাই আর নীল রঙের ট্রাঙ্কের বাক্স। এ মহাবিশ্বের কোন কিছুই তুলনা হবে না এ ট্রাঙ্কের মহামুল্যবান বস্তুগুলোর সাথে। বিশ্বব্যাংক লুটপাট করেও এ ছোট্ট টিনের বাক্সটার পেট ভরানো যাবে না। আমাদের কি দুর্নিবার আকাংখ্যা ছিল এই বাক্সটার প্রতি। বাক্সটা মা কখন খুলবেন, কখন খুলবেন,, কবে খুলবেন সেই প্রত্যাশায় কাটত আমাদের প্রতীক্ষার বেলা। খেলার মাঠে থাকলেও যেন সেই টিনের বাক্সের সুগন্ধি ভেসে আসত।

যে বাক্সের ভেতরে থরে থরে সাজানো মায়ের পরম মমতায় ভাঁজ করে রাখা পাট ভাঙা নতুন দু’চারটে শাড়ি। তার সাথে ২টি ব্লাউজ, দু ‘তিনটি নকঁশী করা হাত পাখা, একটা সুগন্ধি ভরা তিব্বত পাউডারের টিনের কৌটা এবং বাবার রোমান্টিকতার স্মৃতিমাখা একটি কালো সানগ্লাস….. ।আর ছিল সে কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে রাখা দু’চারটা করে সুগন্ধি ন্যাপথলিন…. । দু’চার মাস পরপর মা কখনো এটা খুলে খুলে কি প্রয়োজনে কি দেখতেন জানি না। তবে আমরা খুঁজতাম ন্যাপঁথালিনের গন্ধ! কি মমতাময়ী গন্ধ… চঞ্চলতার অবসরে হারিয়ে যাওয়া শৈশব-কৈশোর বেলার খেলার মাঠ ছাপিয়েও  সেই সুগন্ধী নাকে পোঁছাতো।  তখন খেলার মাঠের সাথীদের চেয়েও মায়ের সেই ট্র্যাংকের ন্যাপথালিনের গন্ধ মাতাল করে দিত আমাদের। মাতাল হই আজো। ন্যাপথলিন দেখলে মনে হয় মুঠো ভরতি কিনে একটা টিনের বাক্সে কাপড়ের ভাঁজে রেখে দেই।ফিরে আসুক সেই দিনগুলো আবার! আমি পাগলের মত ন্যাপথলিন কিনি। কিন্ত মমতা দেবে কে? আমার মায়ের ছোট্ট ঘরেও ট্রাঙ্ক রাখার জায়গাটা ছিল বিশাল । আর আমার এ বিশাল ঘরে একটা ছোট্ট ট্রাঙ্ক রাখার স্থানও নেই। সেই ছোট্টবেলার টিনের বাক্সের ন্যাপথলিনের সুগন্ধে মাতাল হই আজো, যেমনটি হতাম তখনও। মনে হয় আজও খেলার মাঠ থেকে ভোঁ দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে ন্যাপথলিনের সুগন্ধে মাখামাখি করে মাতাল হই। আমাদের মা যেন এক জলজ্যান্ত সুগন্ধীময় ন্যাপথলিনের মমতায় মাখানো মমতাময়ী এক ন্যাপথলিন ভাণ্ডার!

Edited by Benzamin, updated 25-08-2019,

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*