Home / চট্টগ্রামের খবর / রক্ত দিয়ে গোসলের হুমকীদাতা কাউন্সিলর ‘মাছ কাদের’ গায়েব

রক্ত দিয়ে গোসলের হুমকীদাতা কাউন্সিলর ‘মাছ কাদের’ গায়েব

জিএসএস নিউজ ডেস্ক : প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজী, দখলবাজী, নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে তার রক্তে গোসলের খায়েশ, অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, মাদক ব্যবসাসহ অপরাধ জগতের এমন কোন অপরাধ নেই করেনি এমনি ভয়ংকর সেই মানবরূপী দানব। একে একে ৩২টি মামলা থাকা স্বত্বেও দাপটের সাথে জনপ্রতিনিধি সেজে যাচ্ছে তাই করে গেছেন তিনি। চলমান ক্যাসিনোকান্ডে জিরো টলারেন্সে থাকা আওয়ামীলীগ সরকারের ধরপাকড়ে মাফিয়া জগতের অনেকের মতো তিনিও বেমালুম গায়েব হয়ে গেছেন। পাক্কা আওয়ামীলীগার সেজে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা চট্টগ্রামের সেই কাউন্সিলর মাছ কাদের বেগতিক দেখে হঠাৎ করেই আত্মগোপনে যাওয়ার ঘটনা এখন টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে।

তার পুরো নাম আবদুল কাদের। অভাব অনটনে ছোটবেলায় বাজারে মাছ কাটতেন তাই পরবর্তিতে ‘মাছ কাদের’ নামে পরিচিতি পান তিনি। বর্তমানে তিনি ২৮ নং মোগলটুলির ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

কাদেরের অপরাধনামা : বিগত সময়গুলোতে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিলো । খুন, চাঁদাবাজি সহ প্রায় ৩২টি  ফৌজদারি মামলার আসামী। একটি মামলায় সাজা পেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। আরেকটি খুনের মামলা বিচারাধীন। বাকি ২৭ মামলার মধ্যে ২৩টিতে বেকসুর খালাস পেয়েছেন। আর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে চারটি খুনের মামলা।

সূত্র জানায়, নিজের সন্ত্রাসী বাহিনীকে ব্যবহার করে তিনি চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদের ‘কিং’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কোটি কোটি টাকা চাঁদার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রন করেন এলাকার ইয়াবা ব্যবসাও। ধরপাকড় শুরু হলেই ওমরা বা হজ্বের নাম দিয়ে দেশত্যাগ করা তার কৌশল।

কে এই কাদের ? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের রাজনীতি শুরু ছাত্রলীগ ক্যাডার হিসেবে। পরে তিনি মহানগর যুবলীগের সদস্য হন। পলিটেকনিক কলেজের কাদের, সিরাজ, মুগলটলির আজাদ, আলী, পাহাড়তলী থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাসিম, পশ্চিম মাদারবাড়িতে ডাবল মার্ডার, মিজানসহ ৯ জন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী  হত্যার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

বিগত দুই দশকে আগ্রাবাদ মোগলটুলিতে গড়ে তুলেছেন তার অপরাধের সম্রাজ্য। কোনো ব্যবসায়ীই রেহাই পান নাহ তার বাহিনীর হাত থেকে। টং দোকান থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়িক হাউজিং সব জায়গা থেকে তুলেন চাঁদা।

লাল বৃত্ত চিহ্নিত মাছ কাদের। রক্তাক্ত আলী মেম্বার (নীচে) এবং তার বাড়ীতে ভাংচুরের চিত্র

সূত্র মতে, আগ্রাবাদে বড় ছোট টং, ফুটপাতে অস্থায়ী জুতার দোকান ও কাপড়ের ভ্যান বসে প্রায় ৩০০ টি। দোকান বসাতে হলে অনুমতি নিতে হয় কাদেরের লোকজনকে দিতে হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার। মৌখিক চুক্তি হয় ১ বছরের। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেসব দোকান থেকে ৫০০ ও টং থেকে ২০০ করে প্রায় ২ লাখ চাঁদা তুলে এই বাহিনী। এছাড়াও কাদের নিয়ন্ত্রন করেন একাধিক অবৈধ ব্যবসা। পাঠানটুলির ডা. জাফর প্রকাশ জ্যাক্কার বাড়ি, মগ পুকুড়পাড়, ডেবার পাড়, মুগলটলি প্রফেসর লেইনে বসে তার ছত্রছায়ায় ইয়াবার হাট। সেতুবন্ধন নামে একটা ক্লাবে নিয়মিত বসে জুয়ার আসর। এসব ইয়াবা ব্যবসা ও জুয়ার ব্যবসা দেখাশোনা করেন তার অনুগত দিদার উল্লাহ দিদু প্রকাশ মুরগী চোর দিদ্দা। দিদু কক্সবাজারের ইয়াবা সম্রাট মোঃ ফরিদের আপন ভাগনে। মূলত ফরিদের ভাগিনা হওয়ার সুবাদেই কাদেরের নজর কাড়েন তিনি, দায়িত্ব পান ইয়াবা ব্যবসা দেখভালের। কয়েক বছর পূর্বেও ছিচকে ছিনতাইকারী থাকলেও দিদু বর্তমানে কোটিপতির খাতায় নাম লিখিয়েছে। কার্বন ও তরুণী সাজ নামে নগরীর আগ্রাবাদের অভিজাত শপিং মল আখতারুজ্জামান সেন্টারে রয়েছে তার দুটি দোকান।

অভিযোগ রয়েছে,  পতিতা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তার আরেক সহযোগী ওবায়দুল কাদের মিন্টু ওরফে বরিশাইল্ল্যা মিন্টু। আগ্রাবাদ এলাকায় রয়েছে তার একাধিক ফ্ল্যাট। এছাড়াও আগ্রাবাদে সিলভার স্পুনের বিপরীতে পরিত্যক্ত বহুতল ভবনে মুন্না এন্টারপ্রাইজ নামে ব্যানার দিয়ে ভিতরে কেবিন বসিয়ে চালান দেহ ব্যবসা।

সুত্র বলছে, দেহ ব্যবসা থেকেই কাদের ভাগ পান প্রায় ২০ লক্ষ টাকা। পুরো আগ্রাবাদ ও তার আশপাশ জুড়ে  ছিনতাই ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করেন কাদেরের অনুগত আলমগীর হোসেন আলো প্রকাশ পিচ্চি আলো। ডবলমুরিং থানার তালিকাভুক্ত এই ছিনতাইকারী আলোর অধীনে রয়েছে প্রায় শতাধিক প্রফেশনাল ছিনতাইকারী। অভিযোগ ছিনতাইয়ের টাকার বড় একটা অংশেও ভাগ পান কাদের।

কান্নার শেষ নেই পুত্রহারা আজাদের বাবা মফিজুর রহমানের : চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র শফিউদ্দিন আজাদ হত্যা মামলার আসামি আবদুল কাদের। আজাদের বাবা মফিজুর রহমান বলেন, ‘১৮ বছর ধরে ছেলে হত্যার বিচার ঝুলে আছে। আমরা এখন কার কাছে বিচার চাইব।’ ১৯৯৭ সালের ৩০ মে গুলি করে হত্যা করা হয় আজাদকে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে ২০০০ সাল থেকে মামলাটির কার্যক্রম বন্ধ আছে। মামলার প্রধান আসামি আবদুল কাদের।

রক্ত দিয়ে গোসল করতে চেয়েছিল কাদের : মোগলটুলী এলাকায় বয়োবৃদ্ধ আলী মেম্বারকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেই ক্ষান্ত হননি ভয়ংকর এই খুনী। ২০১৫ সালের ১৫ জুন প্রকাশ্যে রমজান মাসের তারাবীহ পড়তে আসা উক্ত বৃদ্ধের রক্ত দিয়ে গোসলের হুমকী দিয়েছিলেন তিনি।

শুধু এসবেই শেষ নয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী মাছ কাদেরের অপরাধনামা। তার অনুগত আবদুর রহিম রাজু প্রকাশ বিহারী রাজুকে দিয়ে অন্যের বিল্ডিং জবরদখল করেন কাদের। মাত্র কয়েক মাস আগেই জোর করে দখল করে ভাড়া দিয়েছেন রামকৃষ্ণ মিশনের বিল্ডিং।কোষ্টারহেজ শ্রমিকদের মজুরি থেকেও ঘন্টায় একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন নেয়ার অভিযোগও রয়েছে  তার বিরুদ্ধে। পেশী শক্তি দিয়ে দখল করে আছেন ঘাট গুদামের ৫ টি ঘাট। তার এই ঘাটব্যবসা তদারকি করেন তার আরেক সহযোগী কথিত শ্রমিক নেতা জাফর। বিদ্যুৎ ভবনেও রয়েছে মাছ কাদেরের রাম রাজত্ব। অস্ত্রসস্ত্র ভয়ভীতি দেখিয়ে বিদ্যুৎ ভবনের প্রতিটা টেন্ডার নিয়ন্ত্রন করে তার ভাই রহমান, খবিরুল মওলা, আবদুল ওয়াদুদ রিপন প্রকাশ সিলেটি রিপন ওরফে বরই গাছতলার রিপন, তসলিম, হাতকাটা হুমায়ুন, দেলোয়ার, ইফতেখার উদ্দীন রুবেল। এই বিষয়ে কথা বলার জন্য কাউন্সিলর কাদেরের মুঠোফোনে বারবার কল দেয়া হলেও তার নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*