Home / চলতি খবর / ঢাবিতে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে বৃহন্নলার ব্যতিক্রমী আয়োজন

ঢাবিতে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে বৃহন্নলার ব্যতিক্রমী আয়োজন

ইফতেখার চৌধুরী : একীভূত সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে গড়ে ওঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বৃহন্নলা’ এবার আয়োজন করেছে এক দিন ব্যাপী একটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান যেখানে ঢাকা শহরের প্রায় ১০০ জনেরও বেশি তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সদস্যরা অংশ নেয়।
গত সোমবার(১লা অক্টোবর)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির স্বোপার্জিত স্বাধীনতা প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠেয় এ ক্যাম্পেইনটিতে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের সাথে অংশ নেয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো অন্তত ১০০ জন শিক্ষার্থী।
দিনব্যাপী এ ক্যাম্পেইনে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ছাড়াও আয়োজন করা হয় একটি সচেতনতামূলক র‍্যালী এবং প্রদর্শন করা হয় ‘উদবাস্তু আরণ্যক’ শিরোনামে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার তৃতীয় লিঙ্গ তথা হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে একটি দেয়াল পত্রিকার।
সমাজের মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন যে জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সহ শহরের বিভিন্ন স্থানে সাহায্য চেয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, তাদের এ আয়োজনে দেখা যায় পুরোপুরি ভিন্ন রুপে। সবাই মিলে একসাথে পরিষ্কার করে টিএসসির আশেপাশের রাস্তার প্লাস্টিক- আবর্জনা। উপস্তিত আশেপাশের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে তাদের কার্যক্রম।
বৃষ্টির কারণে ভিন্নধর্মী এ আয়োজনটির আনূষ্ঠানিকতায় খানিক ব্যাঘাত ঘটলেও দমাতে পারে নি আয়োজক এবং অংশগ্রহনকারী কাউকে, বৃষ্টিতে ভিজেই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যান তারা। দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজের পর একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন ক্যাম্পেইনটিতে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে যেখানে দর্শক মাতানো সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মাধ্যমে হিজরা সদস্যরা পরিচ্ছন্নতা এবং এর গুরুত্বের বার্তাটি সবার ভেতর ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। পরিবার – সমাজ থেকে বিচ্ছিন এ গোষ্ঠীর সদস্যদের এমন মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং পরিচ্ছন্নতা ক্যাম্পেইনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রণ উপস্থিত দর্শকদের ভাবিয়ে তোলে।
বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান ড মাহবুবুর রহমান লিটু এবং বিভিন্ন সংগঠণের নেতৃবৃন্দের উক্ত আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে তারা উপস্থিত হতে পারেন নি। তবে সাংস্কৃতিক আয়োজনের সমাপ্তির পর অংশগ্রহনকারীদের সাথে সাক্ষাত করেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান।
“Change habit save life” স্লোগানের এ আয়োজনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথীরা তাদের অনুভূতি শেয়ার করেন এবং এবং একীভূত সমাজ গড়তে বৃহন্নলার এ উদ্যোগের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করেন।
র‍্যালী শেষে কর্মসূচির এক পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আল আমিন সিদ্দিকী সুজন হিজড়াদের উদ্দেশ্য করে বলেন,“আপনারা এই সমাজেরই মানুষ, এ সমাজেরই অংশ। নিজেদেরকে আলাদা ভাববেন না।সামাজিক কর্মকাণ্ডে আমাদের সাথে ভূমিকা রাখবেন। আপনাদের নিয়ে যদি সম্বিলিতভাবে আমাদের সমাজটাকে গড়ে তুলি , তাহলে পরিবেশ বিপর্যযের কথা বলি আর মানবতার বিপর্যের কথা বলি, সবকিছু কাটিয়ে উঠতে পারবো”।
সমাপনী বক্তব্যে শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী এবং বৃহন্নলা’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সাদিকুল ইসলাম সংগঠনটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনদের যুক্ত করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বৃহন্নলা ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটিকে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। আজকে আমরা ঢাকা শ্বিবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ট্রানজেন্ডার কমিনিটিকে নিয়ে ক্যাম্পাসে পরিচ্ছন্ন অভিযান কর্মসূচি পালন করছি।
এতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে ও সাগ্রহে অংশগ্রহণ করেছে। এটা আমাদের সমাজ ও দেশের মানুষের প্রতি একটি মেসেজ বহন করছে যে, তারাও সমাজ সচেতন, দেশ-জাতির জন্য অনেক কিছু করতে পারেন।
তিনি বলেন, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তাদের প্রতি আমাদের আজন্ম ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বৈষম্যের চর্চায় পরিবর্তন আনতে হবে। পৃথিবীতে দুটি সংকট বিরাজমান, একটি পরিবেশ অন্যটি মানবতা। তাই আমাদের আজকের প্রতিপাদ্য ‘চেঞ্জ হ্যাবিট, সেইভ লাইফ’। কিন্তু তা একদিনে পরিবর্তন করে ফেলা যাবেনা। এজন্যেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত করছি। আর আমরা মনে করি, তরুণ সমাজ চাইলে যেকোনো সংকটের সমাধান অতি দ্রুতই করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন একটু সদ্বিচ্ছার।
আজকে তরুণ সমাজ যদি তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে, আগামী দশ বছরে দেশে জেন্ডার বৈষম্য থাকবে না। বৃহন্নলা পরিবার এমন একটি স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যে, আগামী ১০ বছর পর এ দেশে সবাই সব শ্রেণীর মানুষকে সমান চোখে দেখবে।
ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি সমাজের আট-দশজন মানুষের মতো বাস করবে।মানবতার জয় হবে, একটি সুন্দর, সুস্থ্য সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। গড়ে উঠবে স্বপ্নের সোনার বাংলা।  উল্লেখ্য, উক্ত আয়োজনে সহযোগিতায় ছিল উত্তরণ ফাউন্ডেশন।

 

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*