Home / আন্তর্জাতিক /  শিশু কন্যাদের কাঁধে পিতার মরদেহ : এগিয়ে এলোনা কেউ

 শিশু কন্যাদের কাঁধে পিতার মরদেহ : এগিয়ে এলোনা কেউ

নিউজ ডেস্ক :  চার শিশু কন্যার কাঁধে পিতার মরদেহ। আর কেউ নেই। বার বার মিনতি করেও কাউকে পাশে পেলেন না অসহায় শিশুরা। আহ কি অমানবিক! কি নির্মম! কি নিষ্ঠুর! কি মর্মান্তিক! কত বেদনা দায়ক!
ঘটনাটি ভারতের আলীগড়ের। সেখানে অসুস্থ হয়ে এক ব্যক্তি মারা যান। নাম সঞ্জয় কুমার। বয়স মাত্র ৪৫ বছর। তিনি করোনা রোগি ছিলেন না। অনেক দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। করোনার কারণে শেষ দিকে ঠিক মতো চিকিৎসা সেবাও পাননি। এরপর মারা যান।
উনি যে করোনায় মারা যাননি সেটা জানার পরও কেউ এলো না। প্রতিবেশীরা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।এমনকি আত্মীয়রাও আসলো না। প্রশাসনেরও সহযোগিতা পায়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর উপায়ান্তর না দেখে মরদেহ কাঁধে তুলে শ্মশানের দিকে রওনা দিলেন চার মেয়ে! বেশ খানিক দুরে শ্মশান। লকডাউনের কারণে গাড়ি নেই। হাতে টাকাও নেই। চোখে পানি,কাঁধে পিতার লাশ, শ্মশানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে চার শিশু। মাঝে মাঝে কাঁধ থেকে লাশ নামিয়ে জিরিয়ে নেন। এরপর আবার শুরু হয় লাশ কাঁদে নিয়ে শ্মশান পানে যাত্রা। চোখের জলে হতভাগা পিতাকে শেষ বিদায় জানালো চার মেয়ে।
অনেকে রাস্তার পাশ দাঁড়িয়ে অসহায় শিশুদের ছবি তুললেন, কিন্তু সাহার্য্যে এগিয়ে আসলেন না। আবার সে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও করলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সেই ছবি ভারতের পত্রিকাগুলোও ছাপালো।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের এ খবরটি আমাকে বেশ ভাবাচ্ছেঃ করোনা কি আমাদের নির্দয়,নিষ্ঠুর করে ফেললো! আমাদের সামাজিক বন্ধন, আত্মীয়তার বন্ধন, আত্মার বন্ধন এসব কি ছিন্ন করে দিয়ে গেলো! আমাদের মনুষ্যত্ববোধ কি কেড়ে নিয়ে গেল! ‘সকলের তরে সকলে আমরা,প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’, ‘জীবে প্রেম করে যে জন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর ‘ ‘সেবাই ধর্ম ‘ এসব কি শুধু প্রবাদ-প্রবচনে পরিণত হলো! তাই যদি হয়, পশুত্ব আর মনুষত্বের মধ্যে পার্থক্য থাকলো কি?

শুধু ভারত নয়, আমাদের দেশেও ঘটছে একই অমানবিকতা। কবরস্থানে ব্যানার টানিয়ে দেয়া হচ্ছে এখানে করোনা রোগির দাফন হয় না। কল্পনা করা যায়? কিন্তু তাই’ই হচ্ছে!

দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টে দেখলাম,ঢাকায় সরকারনির্ধারিত খিলগাঁও-তালতলাসহ কোনো কোনো কবরস্থানে করোনায় মৃতদের লাশ দাফনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যানার টাঙানো আছে।
মিরপুর ডেল্টা হসপিটাকে করোনা রোগি শনাক্তের পর লাশ রেখে আত্মীয়রা পালিয়ে গেছে। বগুড়ায় জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরার পর স্বামীকে ঘরে ঢুকতে দেয়নি স্ত্রী।

বগুড়ার শিবগঞ্জ এবং জামালপুরের বকশীগঞ্জে সর্দি-কাশি-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃতের লাশ দাফন নিয়ে স্থানীয় একশ্রেণির লোক বাধার সৃষ্টি করেছে। অনেক বিপত্তির পর শনিবার রাতে সরকারি জমিতে বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার কুদরত ই খুদা শুভ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিয়ে লাশ দাফন আ। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন বা এলাকাবাসীকে দাফনে অংশ নিতে দেখা যায়নি। সেখানকার মানুষের আতঙ্ক কাটেনি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ায় বৃদ্ধা খুকির লাশ দাফনে জটিলতা দেখা দেয় জামালপুরের বকশীগঞ্জেও। উপজেলা প্রশাসন ১৪ ঘণ্টা পরে সেই লাশ দাফন করে।

পৃথক ঘটনায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর মৃতদেহ খিলগাঁও কবরস্থানে দাফন করতে গেলে এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে তার মরদেহ অন্য আরেকটি কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেখানকার লোকজন জানান, তাদের আতঙ্কের কারণ তারা এই কবরস্থানের ভেতর দিয়ে হাঁটাচলা করেন, এখানে করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়া কাউকে কবর দেওয়া হলে তাদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সারাদেশেই অসুস্থতা নিয়ে কেউ মারা গেলেই তাকে নিয়ে চলছে গুজব এবং দাফন নিয়ে জটিলতা। জানাজায়ও অংশ নিচ্ছে সামান্য লোকজন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আইইডিসিআর এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটিতে লাশ দাফনে কোনো ঝুঁকি নেই। করোনায় মৃতের দেহ থেকে সংক্রমণ ছড়ায় না। এজন্য তারা কিছু নিয়মকানুনও ও পরামর্শ দিয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার গোসল ও দাফন সম্পর্কে ইসলামের বিধান সংবলিত পরামর্শ অনুসরণ করতে বলেছে। করোনায় মৃতদের দাফনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, যারা দেশের বাইরের থেকে এসেছেন, তাদের সঙ্গে অনেকে একটু অন্য রকম আচরণ করছেন। এবং অনেক ক্ষেত্রে যারা মৃত্যুবরণ করছেন তাদের ঢাকায় দাফন করতে দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় আপনাদের বলেছি—আপনারা সহনশীল, সংবেদনশীল হোন। বিদেশ থেকে এলেই তারা করোনা আক্রান্ত নন। অনেক রোগেই কিন্তু অনেকে মৃত্যু বরণ করতে পারেন। এখন মৃত্যুবরণ করলে তা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হবেন, এমন কিন্তু নয়। ইতিমধ্যে এই রকম প্রশ্ন ওঠায় অনেকের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছি। তারা সন্দেহের শিকার হলেও পরীক্ষায় তাদের করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়নি।’ আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর জানান, সাধারণত কবর দেওয়ার পর লাশটি থেকে ভাইরাস সংক্রমণের কোনো সুযোগ থাকে না।

রোগী যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন বা তার লক্ষণগুলো যদি করোনা ভাইরাসের উপসর্গের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে ধর্মীয় বিধি মেনে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি রোগীর মৃত্যু এবং তার লাশ দাফনের আগ পর্যন্ত পুরো সময়টিতে সর্বোচ্চ সতর্কতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আইইডিসিআরের প্রশিক্ষিত লোকজনই লাশের গোসল করিয়ে দেবে। এরপর লাশ কাফনের কাপড়ে জড়িয়ে বিশেষভাবে প্যাকেট করবে, যেন ভেতরের কোনো ভাইরাস বাইরে সংক্রমিত না হয়। মৃতদেহ বহনকারী সেই ব্যাগটি কাউকে খুলতে দেওয়া হবে না। এরপর লাশটি একটি সিল করা বাক্স বা কফিনে করে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত থাকবেন তাদের প্রত্যেককে প্রতিরোধমূলক পোশাক পিপিই পরিধান করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। লাশের সত্কার কাজের সময় ভিড় না করা এবং জানাজা নামাজের সময় অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখার কথা জানান তিনি। বাংলাদেশের সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বা এই ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মারা গেলে সেটা সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলার সিভিল সার্জন অথবা সরাসরি আইইডিসিআর-এ অবহিত করতে হবে। আইইডিসিআর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যেভাবে করোনা আক্রান্তে মৃত ব্যক্তির দাফন করা হয়, এ থেকে কোনো বিপদের সম্ভাবনা নেই। আপনারা আপনাদের ভাইকে সম্মানের সঙ্গে শেষ কাজটা করতে সহায়তা করুন। মাটি চাপা দেওয়ার পর করোনা ছড়ানোর সুযোগ নেই। তাই অহেতুক এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো উচিত নয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরামর্শ :করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত ব্যক্তির লাশ নিরাপদভাবে দাফন কিংবা সত্কার ব্যবস্থাপনায় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেজিওর (এসওপি) অনুসরণের জন্য সংশ্লিষ্টদের বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফন বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসরণের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইতিবাচক মত দিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে এ নির্দেশনার বিষয়ে শরিয়তের বিধানও অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বা সন্দেহভাজন কেউ মারা গেলে মৃতদেহ সরানো, সত্কার বা দাফন শুরুর আগে অবশ্যই সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) জানাতে হবে। এর পর চার সদস্যের একটি দল সম্পূর্ণ সুরক্ষা পোশাক পরে মৃতদেহ সত্কার বা দাফনের জন্য প্রস্তুত করবে। মৃত্যুর স্থানেই মৃতদেহ প্লাস্টিকের কাভার দিয়ে মুড়িয়ে রাখতে হবে। কোথায় কবর দেওয়া হবে, ঠিক করে রাখতে হবে সেটিও। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে মরদেহ গোসল করানো যাবে না। পরিবারের অনুরোধ থাকলে মরদেহ গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম বা পানি ছাড়া অজু করানো যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে কাফনের কাপড়ের জন্য অনুরোধ থাকলে সেলাইবিহীন সাদা সুতির কাপড় ব্যবহার করা যাবে কাফন হিসেবে। কাফনের কাপড় প্লাস্টিকের ব্যাগে রেখে তার ওপর মরদেহ রাখতে হবে এবং দ্রুত ব্যাগের জিপার বন্ধ করতে হবে। ব্যাগে কাফনের কাপড় দেওয়ার সময় যারা মরদেহ উঁচু করে ধরবেন, তাদের অবশ্যই পরতে হবে সুরক্ষা পোশাক।

নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, দাফনের জন্য মৃতদেহের সব ছিদ্রপথ (নাক, কান, পায়ুপথ ইত্যাদি) তুলা দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে দিতে হবে, যাতে কোনো তরল গড়িয়ে না পড়ে। এর পর সংক্ষিপ্ত রুটে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মৃতদেহ কবরে নিয়ে যেতে হবে।

পরিবহনে ব্যবহূত গাড়ি সম্পর্কে বলা হয়েছে, যাত্রাকালীন সুরক্ষা নিশ্চিতে মৃতদেহটি হস্তান্তর করতে হবে দাফন পরিচালনাকারী দলের কাছে। পরিবহনে ব্যবহূত গাড়িতে দুটি অংশ থাকতে হবে, যাতে চালক ও পরিবহন কামরার মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক কাচ বা প্লাস্টিকের আবরণ থাকে। পরিবহনের পর ব্যবহূত বাহনটি জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। এ সময় জীবাণুমুক্ত করার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে অবশ্যই পরতে হবে প্রতিরক্ষামূলক পোশাক। দাফনের সময় মৃতদেহ বহনকারী ব্যাগটি কখনোই খোলা যাবে না। দাফনের পর কবর ১০-১৫ সেন্টিমিটার মাটির স্তর দিয়ে ঢাকার পাশাপাশি ঐ স্থানের আশপাশ উপযুক্ত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া ব্যক্তি যে স্থানে মারা গেছেন, সেই স্থানটিও যত দ্রুত সম্ভব জীবাণুমুক্ত করা এবং মৃতদেহ দাফনের পর সেই স্থান ভালোভাবে ঘিরে রাখতে বলা হয়েছে। করোনায় সন্দেহভাজন কারো মৃত্যু হলেও সমান সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে নির্দেশনায়। কখনোই ময়নাতদন্ত করা যাবে না। এ বিষয়ে জনমনে কোনো বিভ্রান্তি, গুজব বা শঙ্কা যাতে না ছড়ায় সে জন্য সঠিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মী, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকসহ সব মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।

আজ এসব দেখে বলতে বড্ড ইচ্ছে করছেঃ” মানুষ তুমি মানবিক হও”।
(কাদের গনি চৌধুরী)

বি:দ্র: পাঠকদের জন্য এটি প্রকাশিত হলো। জিএসএস এর নিজস্ব আইটেম নয়।

 

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*