Home / অর্থনীতি / কর্পোরেট লুটেরার ফাঁদে করোনার ঔষধ

কর্পোরেট লুটেরার ফাঁদে করোনার ঔষধ

ভাষান্তরকারী : তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি : কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন এবং ঔষধ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বৃহৎ ফার্মাসিটিউক্যালগুলোর খবরদারি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন এই কাজের সাথে জড়িত বিশেষজ্ঞরা। এই মহামারীর সময়েও একচেটিয়া ব্যবসা এবং মুনাফা অর্জনই ফার্মাগুলোর মূল লক্ষ্য। সাংবাদিক ডিয়ানা ফালজোন বেশ কয়েকজন মার্কিন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে তুলে এনেছেন এই চিত্র। মার্কিন ম্যাগাজিন ভ্যানিটি ফেয়ারের অনলাইন সংস্করণে গত ২৪ এপ্রিল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। ভাষান্তর করেছেন তানিয়াহ মাহমুদা তিন্নি।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করতে গিয়ে একটি ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানির কাছ থেকে অশুভ মেইল পান। তিনি বলেন, ‘সন্দেহাতীতভাবে সেখানে আর্থিক বিষয় জড়িত ছিল’ এবং আমার মত হয়ত আরো অনেকেই একই সারিতে রয়েছেন।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের দৌড় ভালমতোই চলছে। তবে সাধারণ মানুষ অব্দি পৌঁছুতে ১২ থেকে ১৮ মাস লেগে যেতে পারে। তাই যে ঔষধগুলো আমাদের হাতে আগে থেকেই রয়েছে সেগুলোকে চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য সমানভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টসহ ডানঘেঁষা অনেকেই ম্যালিরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনকে বেছে নিয়েছিলেন এই সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু একটি গবেষণায় দেখা গেছে এই ঔষধটি অকার্যকর, এমনকি এটি বাড়িয়ে দিতে পারে মৃত্যুহার।

নিউ হ্যাভেনে ড. জোসেফ ভিনেৎজ ইয়েল স্কুল অফ মেডিসিনের একজন সংক্রমক রোগতত্ত্ববিদ, ক্যামোস্ট্যাট মেসিল্যাট নামক একটি ঔষধের ক্লিনিক্যাল গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছেন। যেটি জাপানে প্যানক্রিয়েটাটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জোসেফ মনে করেন এটি কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য অনুমোদিত এবং বাজারজাত করা যাবে। তিনি মনে করেন এই পরীক্ষাটি সফল হলে ঔষধটি ‘অ্যা টোটাল গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হবে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন বিপদজ্জনক হয়ে উঠেছে। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ এর ওয়েবসাইটে এই পরীক্ষাটির নিবন্ধন করার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তিনি আমেরিকার একটি বড় ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানির কাছ থেকে ইমেইল পান। ভিনেৎজ বলেন, ‘তারা আমার এই প্রজেক্টটি নিয়ে নিতে চান এবং আর্থিক লাভের জন্য এর মালিকানাও নিজের করে নিতে চান। আমি এই ইমেইলটিকে হুমকি মনে করছি।’

এই গবেষক আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে ক্যামোস্ট্যাট নামক এই ঔষধটি কোভিড-১৯ চিকিৎসায় খুবই ভাল ফল দেবে। এটা নিয়ে জার্মানি এবং ডেনমার্কেও গবেষণা চালানো হচ্ছে। ‘কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী ভাইরাসটির কোষের ভেতর ঢুকে শ্বাসযন্ত্রে বিস্তারের জন্য একটি প্রোটিন লাগে।’ তিনি বলেন, টেস্ট টিউব এবং ইঁদুরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে ক্যামোস্ট্যাট ঔষধটি ভাইরাস যাতে কোষগুলোতে ঢুকতে না পারে সে ব্যাপারে এনজাইমকে বাঁধা দেয়। আরেকটি প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায় ক্যামোস্ট্যাট সার্স আক্রান্ত ইঁদুরকেও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়। যদিও এখন পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এটি মানবদেহে কি ধরনের প্রভাব ফেলে সে সংক্রান্ত কোন তথ্য আমাদের কাছে নাই। কিন্তু এই পরীক্ষা সফল হলে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় এবং সংক্রমণ প্রতিরোধেও এটি কাজ করবে তিনি মনে করেন তিনি।

এই ঔষধটির প্রস্তুতকারী হল জাপানের অনো ফার্মাসিটিউক্যাল নামক বৃহৎ একটি কোম্পানি, যাদের হেড কোয়ার্টার ওসাকায়। এই কোম্পানিটি ডা. ভিনেৎজের গবেষণায় ব্যবহার করতে প্রায় ৩০০ রোগীর জন্য ক্যামোস্ট্যাট পিল সরবরাহ করবে। ট্রায়াল শুরু করতে এখন শুধু অনুমতি দরকার। তিনি বলেছেন, রোগীদের ভর্তি করব যাতে তারা প্রতিদিন এসে নিজেদের পরীক্ষা করায়, ঔষধ গ্রহন করে, নিরাপত্তার জন্য তাদের লক্ষণগুলো জানায় এবং ঔষধ প্রয়োগের পর কোন উন্নতি হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখে। আমরা খুব কাছ থেকে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করব। তাদের অক্সিজেন লেভেল পরীক্ষা করে দেখা হবে যে তাদের হাসপাতালে নিতে হবে কিনা।

২০ এপ্রিল ভিনেৎজ ট্রায়ালের অনুমতির জন্য রেজিস্ট্রার করার পর যে ইমেইলটা পেয়েছিলেন সেটি এক রকমের হুমকিস্বরূপ। এই ইমেইলটির একটি কপি দ্য হাইভ নামে বৃহৎ একটি ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধি পর্যালোচনা করেছে। তারা লিখেছে এই কোম্পানিটি নিজেই BARDA-র  (The Biomedical Advanced Research and Development Authorit) সাথে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ যাচাই বাছাই করছে। এবং এটা জেনে রাখা জরুরি এই কোম্পানিটির একটি “open IND” রয়েছে। এই আইএনডি হল যে কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করার অনুমতিপত্র। এই কোম্পানি ভিনেৎজকে বলছে, আইএনডির জন্য আবেদন করলেও এখনও পায়নি। তার বিভিন্নরকম ডাটার প্রয়োজন হতে পারে যেটা কিনা কোম্পানির আইএনডির সাহায্যে সে পেতে পারে। এক্ষেত্রে কোম্পানির কাছ থেকে তাকে একটা অনুমোদনপত্র নিতে হবে। মেইলে আরও বলা হয় তারা ভিনেৎজের সাথে মিটিং এর মাধ্যমে এই বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী।

ফ্রান্সের একটি গবেষণাগারে বিজ্ঞানী। (ছবি: সংগৃহিত)

ভিনেৎজের মনে হয়েছে কোম্পানিটি বলতে চাচ্ছে এই কোম্পানির মাধ্যমে তাকে কাজ করতে হবে। তারা চায় আমি যাতে তাদের অধস্তন হয়ে কাজ করি। আমি মনে করি এটা একটা হুমকিমূলক ইমেইল, ভিনেৎজ আবারও বলেন। সেখানে অবশ্যই আর্থিক বিষয়ও জড়িত ছিল। তিনি আরও বলেন কোম্পানি এই ক্যামোস্ট্যাটকে হয়তো অরফান ড্রাগ হিসেবে পেতে চেয়েছিল।  অরফান ড্রাগ এক্টটি ১৯৮৩ সালে পাশ হয়েছিল । এই এক্ট অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে বিরল রোগের ঔষধ প্রস্তুতকে উৎসাহিত করে, পাশাপাশি প্রণোদনা দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে ফিলাডেলফিয়ার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ম্যারিওন ম্যাস বলেন, এই এক্ট অনুযায়ী কোন কোম্পানি এ ধরনের ঔষধ উৎপাদনের অনুমতি পেলে ৭ বছরের জন্য মার্কেট এক্সক্লুসিভিটি পাবে। অর্থাৎ এই সাত বছর অন্য কোন কোম্পানি একই ধরনের ঔষধের বিজ্ঞাপন দিতে পারবেনা। এছাড়াও ক্লিনিক্যাল টেস্টের জন্য ৫০% কর মওকুফ এবং ট্রায়াল পরিচালনা করতে সরকারি অনুদানও পাবে।

এছাড়াও যদি কোন কোম্পানির গবেষণা আওতাভুক্ত কোন ঔষধ অরফান ড্রাগ হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে তারা একটি রশিদের জন্য আবেদন করতে পারবে যেটা কিনা কোম্পানির এফডিএ অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করতে সাহায্য করবে। ফলে তারা ঔষধটি খুব তাড়াতাড়ি বাজারেও নিয়ে আসতে পারবে। মুনাফা লাভের পথটি তরান্বিত হবে। এমনকি এই ঔষধটি তারা অন্য কোম্পানিগুলোর কাছে চড়া দামে বিক্রি করতে পারবে। অন্য একটি কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে ভিনেৎজ বলেন, এই কোম্পানিটি রেমিডেসিভের মত ক্যামোস্ট্যাটকে অরফান ড্রাগ হিসেবে পাওয়ার জন্য আবেদন করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটি ফার্মাসিটিউক্যাল কোম্পানি জিলেড সায়েন্স ইবোলা ভাইরাসের জন্য ব্যবহৃত এন্টিভাইরাল ঔষধ রেমডেসিভিরকে মার্চেই অরফান ড্রাগ হিসেবে ঘোষণা দেয় কারণ তখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ কে বিরল রোগ ভাবা হচ্ছিল। এমনকি শুরুতে কিছু ডাক্তার বলেন এটি কোভিড-১৯ চিকিৎসায় কাজ করছে। কিন্তু তারা তখনও সাবধান করেন যে গবেষণায় এটা অমিমাংসিত। কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে জিলেড তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে জিলেড এই ঔষধটির ব্যবহার সাময়িক স্থগিত করার পর যখন এটা জানা গেল যে মারাত্মক অসুস্থ কোভিড রোগীদের জন্য ঔষধটি গ্রহণ করা কষ্টসাধ্য, তখন সমালোচনা আরো বাড়ল। পরবর্তীতে জিলেড এক বিবৃতির মাধ্যমে আমেরিকার খাদ্য এবং ঔষধ প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করে যাতে এটির অরফান ড্রাগ মর্যাদা বাতিল করা হয়। এছাড়া অরফান ড্রাগ হিসেবে প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধাগুলোও তারা আর ব্যবহার করবে না বলে জানায়।

‘আপদকালের সুযোগে মুনাফা অর্জনের ব্যাপারটি নিয়ে ব্যাপক এবং তীব্র জনরোষ তৈরি হয়েছিল’ জিলেড সম্পর্কে ভিনেৎজ বলেন। নিউইয়র্কের ইম্যুনলজিস্ট এবং এলারজি বিশেষজ্ঞ ড. পুরভি পারিখের মতে, ‘মহামারীর সময় জীবন রক্ষাকারী ঔষধ নিয়ে এ ধরনের একচেটিয়া ব্যবসা একটি কোম্পানির ভাবমূর্তি খারাপ করে।’

একজন জৈবপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা বলেছেন, “যদিও তাদের কাছে প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ নেই, বৃহৎ ফার্মাসিটিউক্যালগুলো কোভিড-১৯ এর ট্রায়ালে নাক গলাচ্ছে। কিন্তু আমি বিভিন্ন মাধ্যমে শুনছি তারা রোগী এবং ট্রায়াল সাইটগুলো জবরদখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো একচেটিয়া দখলের জন্য  ফার্মাগুলোর পর্যাপ্ত টাকা এবং রাজনৈতিক যোগসাজশ দুটোই রয়েছে।  নতুন ড্রাগগুলো প্রায়ই ছোট জৈবপ্রযুক্তিক গবেষণাগার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উদ্ভাবিত হয় বড় ফারমাসিটিউক্যাল থেকে নয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুদান তাদের কাছে যায় যাদের রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে এবং বৃহৎ ব্যাবসায়ী। যদিও ছোট সংস্থাগুলো এমনকি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান অনেক কিছু অর্জন করতে পারে স্বল্প খরচে।

ফিলাডেলফিয়ার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ম্যাস বলেন, ফার্মাগুলো ‘এই উদ্ভাবন প্রক্রিয়ার মূল উৎসটি করায়ত্ত করতে লোভনীয় প্রস্তাব এবং টাকার পাহাড় ব্যবহার করে।’ এক্ষেত্রে গ্লিভেক এর উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। নোভারটিস ফার্মাসিটিউক্যালের সব থেকে বিক্রিত পন্য হল লিউকোমিয়ার ঔষধ গ্লিভেক। যেটি কিনা লিউকোমিয়া এন্ড লিম্ফোমা সোসাইটির সহযোগিতায় ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ গ্র্যান্টস এর অর্থায়ণে উৎপাদিত হয়। এই অর্থ আসে করদাতাদের কাছ থেকে। “ঔষধটি অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে যদি তাদের কাছে ঐ নির্দিষ্ট  ব্রান্ডের একটি মাত্র পিল কেনার জন্য যদি ৯৭ ডলার খরচ করার সামর্থ থাকে।“ ম্যাস বলেছেন, কিছু ফারমাসিটিউক্যাল কোম্পানি অনেক ভাল কাজ করেন কিন্তু এই একচেটিয়া ব্যবসার চক্রটি বিপথগামী প্ররোচনা তৈরির মধ্য দিয়ে বহু দশক ধরে ওয়াশিংটন ডিসিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

মিসিসিপির ডাক্তার এবং মিসিসিপি স্ট্যাট ম্যাডিক্যাল এসোসিয়েশনের বোর্ড অফ ট্রাস্টির চেয়ারম্যান ড জেনিফার ব্রায়ান অন্যের ঔষধ উৎপাদন, একচেটিয়া স্বত্বাধিকার লাভ ইত্যাদিসহ বৃহৎ ফার্মাগুলোর অনৈতিকতার একটা লম্বা তালিকা বলে গেলেন । তাঁর মতে, ‘এটি খুবই পীড়াদায়ক যে গবেষণা এবং বাজারের একটা অংশকে আতঙ্কিত করতে সম্ভাব্য কোভিড-১৯ চিকিৎসার উপর এই সংহতিনাশক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চলছে কিন্তু এটা আশ্চর্যজনক নয়।’

‘তারা বোধহয় আমাকে সাদাসিধা মনে করেছে কিন্তু আমি জানি আমার সাথে ইয়েলের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নিয়ন্ত্রণকারী পুরো টিমটি রয়েছে’ বলেন ভিনেৎজ। তিনি আরও বলেন অনেকগুলো বাঁধা থাকা সত্ত্বেও তিনি ক্যামোস্ট্যাট ট্রায়াল রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।

বি:দ্র: সংকলনটি অনলাইন থেকে নেয়া। জিএসএস  এর নিজস্ব আইটেম নয়।

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*