Home / জেলার খবর / রূপগঞ্জের বাদ্যকর সম্প্রদায় পেশা বদলে যখন দিনমজুর

রূপগঞ্জের বাদ্যকর সম্প্রদায় পেশা বদলে যখন দিনমজুর

মাহবুব আলম প্রিয় :  ‘তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল।’ঢাক আর ঢোল নিয়ে প্রচলিত হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব নিয়েই শুধু নয়। অন্ধ বিশ্বাস আর কথিত মান্বতের নামে গ্রাম কিংবা শহরে মাজার গুলোতে ঢোল,বাঁশি সহ গান বাজনা নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কমেছে আগের তুলনায়। তাই বাদ্যকরদের সেই বাংলার সংস্কৃতির নামে তাকদুম তাকদুম।গানটাকে পুঁজি করে নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ঢোল নিয়ে এই গান কণ্ঠে তুলেছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ শচীন দেব বর্মন। পরে শিল্পী কুমার বিশ্বজিত গানটি তার কণ্ঠে তুলে নিয়ে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছিল বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই বাদ্যযন্ত্রটিকে। এ বাদ্য যন্ত্রটির ব্যবহার বহু উৎসবে এখনো শোভা পায়। তবে আগের তুলনায় অনেক কম। যদিও হিন্দুরা তাদের ধর্মীয় রীতি হিসেবে ধরে রাখেন। তবে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বাদ্যকরদের পেশা বদলাতে দেখা গেছে।
এ অঞ্চলে এক সময় কিছু মুসলমান ও শিয়া সম্প্রদায় বাদ্য বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাদের ছিল ভিন্ন ভিন্ন দল। তারা গ্রাম-বাংলায় মেলা-উৎসব যেখানে হতো সেখানেই ছুটে যেতেন। তাদের মনোমুগ্ধকর বাজনার তালে নাচাতেন যে কাউকে। ঢাক-ঢোল-কাড়া-কাঁসা-সানাই ছাড়াও নববর্ষ, কি আনন্দ শোভাযাত্রা। আর অনেক আগে থেকে এর ব্যবহার তো রয়েছেই হিন্দু সম্প্রদায়ের বারো মাসের তেরো পূজা-পার্বণ, বিয়েতে-অন্নপ্রাসণে। গুতিয়াবোর আগার পাড়ার প্রবীন বাদ্যকর আজাহার আলী বলেন, এক সময় সরকারি ডিক্রি বা বিজ্ঞপ্তি জারি করতেও এই বাদ্য ব্যবহার হতো। বলা হতো ঢোল সহরত। এ সব বাদ্যযন্ত্রীদের ডাকা হয় নানা নামে। বলা হয় ঢুলি, বাদ্যকর কিংবা শব্দকর। এখন আগের মতো ঢুলিদের কদর নেই। তাই আগারপাড়ার ৩০ টি পরিবারের পেশা এখন কেউ দিনমজুর,কেউ জমির দালাল, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত। তাদের অনেকেই বাঁশ শিল্পের সঙ্গে জড়িত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি আরো জানান, এক সময় হিরনাল মাজারে কিংবা আশপাশের মাজারে মান্বতের ঢোল বাজাতেন। এতে১ দিনে ঢোল বাজিয়ে আয় করতেন ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। এভাবে সপ্তাহে ৪ / ৫ টি পোগ্রাম করতে পারতেন। এখন হিরনাল মাজারে মেলা বন্ধ ও মানুষ সচেতন হওয়ায় এসব মান্বত কেউ করছেন না। আমরাও পেশা বদলে নিয়েছি।
কথা হয় পিতলগঞ্জের লোকজ( গাজী কালু) শিল্পি গায়েন হাছানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে বাড়ি বাড়ি গাজী কালুর গান মান্বত করতো লোকজন। ওই গান শুনাতে ঢুলির ব্যবহার থাকতো। এখন গাজীর গীত হয়না। তাই ঢুলিরা পেশা বদলে নিয়েছে। পিতলগঞ্জে এমন দুটি দল আছে। যাদের অনেকেই এখন কাঞ্চন বাজারে তরকারী বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে এখনো গ্রামের হাটবাজারে কোন নোটিশ বা জরুরি বার্তা পৌঁছাতে ব্যবহার হয় এ ঢোলের। কোথাও ঢোলের সংকট থাকায় মুড়ির টিন বাজিয়ে থাকেন কেউ কেউ। কথা হয় মনিপাড়ার কিশোর দাসের সঙ্গে তিনি বলেন, পূঁজা-পার্বণে লাগে তিন বাদ্য। সেটা হলো ঢাক-ঢোল-কাঁসা। আবার বিয়েতে-অন্নপ্রাসণে লাগে চার বাদ্য। যেমন-ঢোল কাড়া কাঁসা সানাই।তাই ঢোলের কদর এখনো হিন্দু সম্প্রদায়ে আছে।
প্রবীণ কবি ও সাংবাদিক আলম হোসেন বলেন, মুলত বাদ্যকর সম্প্রদায় ছিলো সমাজে এক পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী। পূজা-পার্বণ-বিয়ে-উৎসবে তাদের ডাক পড়তো। কিন্তু সেখানে অন্দর মহলে প্রবেশাধিকার ছিলো না তাদের। বাবু সমাজ তাদের বাহির মহলে আপ্যায়ন করে বিদায় করতেন কিছু বকশিস দিয়ে। সূত্র জানায়, উপজেলার ভোলাবো, গোলাকান্দাইল, ভুলতা ও মুড়াপাড়াসহ বেশ কয়েক স্থানে শতাধিক বাদ্যকর পরিবারের বসবাস। এছাড়াও কালীগঞ্জ থেকে রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গুতিয়াবো আগার পাড়া এলাকায় রয়েছে অর্ধ শতাধিক মুসলিম বাদ্যকর সম্প্রদায়। এক সময় তারা বাদ্য বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও এদের প্রায় সবাই পেশা বদলেছেন। কেউ করেছেন চায়ের দোকান। কেউ বা করেন ঘরামির কাজ। কেউ কাঠ চেড়াইয়ের। কলামিষ্ট ও গবেষক লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, ৪৭ সালের পর থেকে নানা কারণে দেশত্যাগ করেছেন বাবু সমাজের কর্তারা। কমে গেছে পূজা-পার্বণের জৌলুস। আগের মতো আর ডাক পড়ে না তাদের। ঢাক ঢোলের পরিচয় অনেক কম। তবে পূর্বাচলের বাঙ্গাল বাড়িতে সেই ঢোল সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। তবে লোকজ এ সংস্কৃতি রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।

 

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*