Home / চলতি খবর / কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদ জামাত থেকে এবার বঞ্চিত হতে যাচ্ছে লাখো মুসুল্লি

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদ জামাত থেকে এবার বঞ্চিত হতে যাচ্ছে লাখো মুসুল্লি

ফারুকুজ্জামান (কিশোরগঞ্জ) :  মহামারি করোনায় প্রায় দুই শত বছরের ইতিহাসে এবারেই প্রথম কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ১৯৩ তম উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদ জামায়াতটি হচ্ছে না । বিষয়টি  মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী সুত্রে জানা গেছে।

তিনি জানান, গত ১৪ মে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণপূর্বক পবিত্র ঈদ উল ফিতরের জামায়াত নিকটস্থ মসজিদে আদায়ের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। তবে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে পাঞ্জেগানা মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়ে থাকে সেখানে কী ঈদ জামায়াত হবে কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী সোমবার অনুষ্ঠিতব্য সভায় এই সিদ্ধান্ত জানানো হবে ।

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ইতিহাস কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তের বিস্তীর্ণ এলাকার নাম শোলাকিয়া। শোলাকিয়া মাঠ এলাকার পূর্ব নাম ছিল ইচ্ছাগঞ্জ। শোলাকিয়া সাহেব বাড়ির পূর্ব পুরুষ শাহ সুফি মরহুম সৈয়দ আহম্মেদ ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে এই স্থানে সর্বপ্রথম একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে শোলাকিয়া মাঠের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তীতে হয়বতনগরের শেষ জমিদার দেওয়ান মোহাম্মদ মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সালে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের নামে ২ একর ৩৫ শতক জমি দান করেন। দলিল অনুযায়ী ওই সময়ের ২শ বছর আগে থেকেই এ ঈদগাহে দু’টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল।

সৈয়দ আহাম্মদ সাহেবের পর উত্তরাধিকারসূত্রে হয়বতনগর জমিদার বাড়ির তৎকালীন জমিদার সৈয়দ মো. আবদুল্লাহ ১৮২৯ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্তু শোলাকিয়া মাঠের ইমাম ছাড়াও ঈদগাহের সর্বপ্রথম মোতাওয়াল্লি ছিলেন। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে হয়বতনগর জমিদার পরিবার থেকে মোতাওয়াল্লি ও তাদের সিদ্ধান্ত মতে ইমাম নিযুক্ত করা হতো। বর্তমান জেলা প্রশাসক মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের আয়তন বর্তমানে খাস জমি নিয়ে প্রায় ৭ একর জমি রয়েছে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে। ঈদগাহের চারপাশে প্রাচীর ঘেরা মাঠে মোট ২৬৫টি কাতার রয়েছে। প্রতিটি কাতারে প্রায় ৪শ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারবেন। সে হিসাবে মাঠের ভেতরে প্রায় সোয়া লাখ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে মাঠের আশপাশের রাস্তা ও বাড়িঘরসহ প্রায় দুই লক্ষাধিক মুসল্লির বেশি নামাজ আদায় করে থাকেন।

শোলাকিয়া নামকরণের ইতিহাস কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক ঈদগাহের সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে অনেক জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।একটি জনশ্রুতিতে জানা গেছে, বহুকাল আগে একবার এ মাঠে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় সোয়া লাখ। এই সোয়া লাখ থেকেই উচ্চারণ বিবর্তনে বর্তমান শোলাকিয়ার নামকরণ হয়েছে।অন্য জনশ্রুতিতে জানা গেছে, আজকের মৃতপ্রায় নরসুন্দা নদীটি এককালে ছিল সুগভীর আর বেগবতী। নদীটিতে নিয়মিত বড় বড় নৌযান চলাচল করতো এবং মোঘল শাসনামলে বন্দরটি এই অঞ্চলের বিখ্যাত নৌবন্দর হিসেবে খ্যাত ছিল। একবার বন্দরটিতে সন্নাসীদের ১৬টি লবণ বোঝাই নৌযান এসে নোঙ্গর করেছিল। এর ফলে উক্ত লবণ বোঝাই নৌযান থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ যে শুল্ক আদায় করেছিল, সে থেকে উক্ত এলাকাটি উচ্চারণ বিবর্তনে ক্রমান্বয়ে শুল্ক থেকে শোলাকিয়া নাম প্রচলিত হয়েছিল।

তৃতীয় জনশ্রুতিতে রয়েছে, ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির আমলে সেখানে নরসুন্দা নদীবন্দর ছিল, তার পাশেই ছিল ফরাসি বণিকের লবণ ও শুকনা মাছের আড়ত। সে আড়তের জন্য বাইরে থেকে যে লবণ আমদানি ও শুকনা মাছ রপ্তানি করা হতো, তার জন্য কোম্পানিকে বিশেষ শুল্ক দিতে হতো। এর ফলে এ শুল্ক আদায়ে ঘাট থেকে এলাকাটি উচ্চারণ বিকৃতি করে ক্রমান্বয়ে শোলাকিয়া নামে পরিচিত হয়ে উঠে।

চতুর্থ জনশ্রুতি রয়েছে, মোঘল আমলে স্থানীয় এলাকাটিতে পরগনার রাজস্ব আদায়ের একটি অফিস ছিল। সে অফিসের অধীনে পরগনার রাজস্ব ছিল সোয়া লাখ টাকা। সোয়া লাখ টাকার রাজস্ব আদায়ের অফিসের উচচারণ বিবর্তনে এলাকাটির নাম রয়েছে শোলাকিয়া।

জানা গেছে, বৃটিশ, পাকিস্তুান ও বর্তমান বাংলাদেশ আমলের গোড়ার দিকেও এ দেশের প্রত্যন্ত জেলাসমূহ ছাড়াও সুদুর ভারতের বিভিন্ন রাজ্য আসাম, পাকিস্তান, ভূটান, ইরান, নেপাল, সৌদিআরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলমানগণ শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদের জামাতে শরিক হতেন। সে সময়ে এ ঈদগাহে মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে ভৈরব-টু-কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ-টু-কিশোরগঞ্জ রেলপথে দুটি বিশেষ ট্রেন চালু ছিল। হয়বতনগর হাবিলীতে ঈদের জামাত হিসেবে অতিথিদের জন্য মুসাফির খানা নামে একটি বড় আকারের ঘরও ছিল। ঈদের নামাজের ২/৩ আগে থেকেই দলে দলে মুসল্লিরা এসে হয়বতনগর হাবিলিসহ ঈদগাহ ও এর আশপাশ এলাকায় অবস্থান নিত। এখন অবশ্য তেমন দেখা যায় না। তবে শহরের বর্তমান হারুয়া এলাকায় ছোট আকারের বেশ কয়েকটি মুসাফির খানা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। কিন্ত বর্তমানে বিশ্বে করোনা পরিস্থিতির কারণেএবারেই প্রথম বৃহত্তম ঈদ জামায়াতটি হচ্ছে না।

 

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*