Home / মুক্তমত / “জাতির জনক” বিভ্রাট! – ধর্মপ্রচারের আড়ালে সুক্ষ্ম রাজনৈতিক মিথ্যাচার!

“জাতির জনক” বিভ্রাট! – ধর্মপ্রচারের আড়ালে সুক্ষ্ম রাজনৈতিক মিথ্যাচার!

শাহরিয়ার শহীদ শুভ : আমাদের জাতির জনক কে? এই প্রশ্নে হযরত ইবরাহীম(আঃ) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রতিপক্ষ হিসাবে দাড় করানোটা ছিলো ইতিহাসের অন্যতম নিন্দনীয় একটা ষড়যন্ত্র! জাতি হলো এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্প্রদায়। জাতিবোধ একটি নৈতিক এবং দার্শনিক চেতনা যা জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়। জাতির জনক হলো কোন ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দেওয়া একটি উপাধি যিনি কোন দেশ, রাষ্ট্র বা জাতি প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি ভূমিকা পালন করে থাকলে তাদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতা জনক কথাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হযরত ইবরাহীম(আঃ) ইসলাম ধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ নবী ও রাসূল। পবিত্র কুরআনে তার নামে একটি সূরাও রয়েছে। পুরো কুরআনে অনেকবার তার নাম উল্লেখিত হয়েছে। ইসলাম ছাড়াও, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মেও ইব্রাহিম শ্রদ্ধাস্পদ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। এজন্য হযরত ইবরাহীম(আঃ) কে সেমেটিক ধর্মগুলোর জনকও বলা হয়ে থাকে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় যেমন কুরবানি,হজ্জ পালন,মিসওয়াক,খৎনা করা,প্রস্রাব শেষে পানি নেওয়া এগুলো শুরু করেন এবং একেশ্বরবাদের চর্চা চালু করেন যা পরবর্তীতে উনার পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ইসহাক(আঃ) চালু রাখেন।বিভিন্ন সূত্রমতে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর ৪ জন পুত্র ছিলো মতান্তরে ৬-১২ জন সন্তানের জনক ছিলেন তিনি। হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ইসহাক(আঃ) দুজনেই গোষ্ঠীপতি ছিলেন, উনাদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে অনেক নবী ও রাসুল আগমন করেন। ইসলাম ধর্ম,ইহুদি ধর্ম,খ্রিষ্টান ধর্ম,বাসাই ধর্ম এর অনুসারীগন যাদের স্বীয় ধর্মের প্রবর্তক মনে করেন তারা সবাই হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর পরবর্তী প্রজন্মের বংশধর! পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত নবী ও রাসুলদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম(আঃ) এর পূর্ববর্তী নবীরা হলেন, হযরত আদম(আঃ),হযরত ইদ্রিস (আঃ), হযরত নূহ(আঃ), হযরত হুদ (আঃ), হযরত সালেহ (আঃ)। উনারা প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট কোন সময় বা নির্দিষ্ট কোন জাতির উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছিলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন প্রথম প্রেরিত সামগ্রিক নবী ও রাসুল।উনার উপর প্রথম ছহীফা নাজিল হয়েছিলো। উনার পরবর্তী বংশধরের সবাই “আরব” জাতির। সেজন্য উনাকে আরব জাতির অবিসংবাদিত পিতা হিসাবে গণ্য করা হয়। সেই আরব জাতির মধ্য থেকেই আরো বিভিন্ন ধর্মের প্রবর্তকরা আগমন করায় হয়রত ইবরাহীম (আঃ) সেসব ধর্মের বা সেসব বংশের পূর্বপুরুষ বা প্রবর্তকপুরুষ হিসাবে বিবেচিত। পবিত্র কোরআনের সুরা ইবরাহীম এর ৩৫ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে , “ওয়া ইয কা-লা ইবরা-হীমুরাব্বিজ‘আল হা-যাল বালাদা আ-মিনাওঁ ওয়াজনুবনী ওয়া বানিইইয়া আন্না‘বুদাল আসনা-ম।” “স্মরণ কর, ইবরাহীম বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! এই শহরকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে মূর্তি পূজা হতে দূরে রাখুন।” “And (remember) when Ibrahim (Abraham) said: O my Lord! Make this city (Makkah) one of peace and security, and keep me and my sons away from worshipping idols.” এই জায়গায় পুত্র বলতে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর পুত্রগণকে বোঝানো হয়েছে মতান্তরে উনার পরবর্তী সকল বংশধরকে বলা হয়েছে বলে তাফসির করা হয়। বিভ্রান্তি টা সেখান থেকেই শুরু হয়, উনি কি শুধু মুসলিম জাতির পিতা? উনি ইসলাম সহ আরো অনেক ধর্মের প্রবর্তকদের পূর্বপুরুষ হওয়ায় যৌক্তিকভাবে উনি সেসব ধর্মেরও পিতা! তাছাড়া বর্তমান সময়ে ইসলাম আর কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা বংশধরদের(আরব) মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই! ইসলাম এখন বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সেজন্য তথ্য ও যুক্তি বলে উনাকে ” আরব জাতি” র পিতা হিসাবে গন্য করাটাই যথোপযুক্ত!বাকিটা আপনার স্বীয় বিশ্বাস!
আধুনিক জাতীয়তাবাদ এর ধারনা থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্র বা দেশ তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির উপর সর্বজনবিদিত ভাবে একজন বা একাধিক জনকে “জাতির জনক” হিসাবে সম্মানিত করে থাকেন। এমনি বর্তমানে পৃথিবীর মুসলিম দেশ হিসাবে খ্যাত সকল দেশেই কাউকে না কাউকে “জাতির জনক বা জাতির পিতা” হিসাবে সম্মানিত করা হয়। মধ্যপ্র্যাচের আরবদের বিচরনক্ষেত্র ইসরায়েল এর লোকেরা নিজেদের হযরত ইবরাহীম(আঃ), হযরত ইসহাক (আঃ), হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর বংশধর মনে করলেও আধুনিক জাতীয়তাবাদ এর ভিত্তিতে থিওডোর হের্জল কে জাতির জনক হিসাবে সম্মানিত করা হয়। আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ আধুনিক সৌদ আরবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম বাদশাহ।উনাকেও সৌদি আরবে জাতির জনকের সম্মান দেয়া হয়। মুসলিম প্রসিদ্ধ দেশ হওয়ার পরও সংযুক্ত আরব আমিরাতে জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানকে জাতির জনক হিসাবে সম্মানিত করা হয়। সর্বোচ্চ মুসলিম বসবাস করা দেশ ইন্দোনেশিয়াতে সূর্কণকে এবং বর্তমান মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক কে জাতির জনক হিসাবে সম্মানিত করা হয়। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দেশ ইরান তাদের পারস্য সংস্কৃতি ও সামাজিক বোধ থেকে “দ্বিতীয় কুরুশ” কে জাতির পিতার সম্মান দিয়েছে। দক্ষিন এশিয়ায় আফগানিস্তানে আহমদ শাহ দুররানি ও পাকিস্তানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কে জাতির পিতা হিসাবে সম্মানিত করা হয়। কিন্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসাবে সম্মানিত করতে এখনো কিছু মানুষ কেন ধর্মান্ধতাকে সামনে এনে দাড় করায় সেটা ভেবে একজন বাংলাদেশি হিসাবে লজ্জিত হই। জাতীয়তাবাদের পূর্ণ প্রকাশ ও রাষ্ট্রহিসাবে স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অবদান রাখা ব্যাক্তিকে প্রতিটা দেশেই (মুসলিম,নন-মুসলিম) সম্মানিত করতে পারে সেখানে আমাদের মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখা হয়েছে পরিকল্পনামাফিক! ৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস ও অবদানকে বাংলাদেশ থেকে মুছে ফেলতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তৎপর হয়ে উঠে! তাদের প্রথম চেষ্টাটা নিতান্তই হাস্যকর,সেটা হলো স্বাধীনতার ঘোষক ও প্রথম রাষ্ট্রপতি হলো মেজর জিয়া! এটা প্রমান করতে পারলে তারা জাতির জনক হিসাবেও জিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করার চরম দুঃসাহস দেখাতো! কিন্ত তাদের এই পরিকল্পনা ছিলো সম্পূর্ন অমূলক ও বাস্তববিরোধী ছিলো। যখন জিয়াকে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলো না তখন জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমাদের জাতির জনক হিসাবে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অপপ্রয়াস চালাতে থাকে।সেক্ষেত্রে তারা বরাবরের মতো আমাদের ধর্মান্ধতাকে কাজে লাগায় এবং সুক্ষ্ণ ইতিহাস বিকৃতি শুরু করে! তখন দেলোয়ার হোসেন সাইদী(দেইল্লা রাজাকার), কাদের মোল্লা,নিজামিরা রাজনৈতিক ইসলাম প্রচারের কাজে লেগে যায়! তারা মানুষকে বোঝাতে শুরু করেন যে, “হযরত ইবরাহীম (আঃ) আমাদের জাতির পিতা এবং মুসলিম হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসাবে মানলে ধর্ম চলে যাবে! “

তাদের এই মিথ্যাচার ওয়াজ মহফিল থেকে শুরু করে বই, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র সবজায়গায় ছড়াতে থাকে। শিবিরের কর্মীদের কাজে লাগিয়ে তারা প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠচক্রের মাধ্যমে এসব ছড়াতে থাকে, যার কারনে এখনো অনেক বাংলাদেশী মুসলমান নিজেদের জাতির পিতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু কে মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করে! যেহেতু বিশ্বের প্রায় প্রতিটা মুসলিম দেশ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে তাদের জাতির পথপ্রদর্শক কে জাতির পিতা /জাতির জনক হিসাবে সম্মানিত করতে পারেন। সেক্ষেত্রে একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশর নাগরিক হিসাবে আমরাও বঙ্গবন্ধু কে তার অসীম অবদানের জন্য জাতির পিতা হিসাবে সম্মানিত করতে পারি। যেহেতু অন্য দেশের মুসলমানদের ধর্ম চলে যাচ্ছে না সেক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদেরও ধর্ম চলে যাবে না! ধর্মীয়ভাবে হযরত ইবরাহীম (আঃ) আমাদের কাছে একজন খুবই শ্রদ্ধাভাজন ব্যাক্তি,উনার শ্রদ্ধার জায়গাটা আলাদা, উনাকে ব্যাবহার করে যারা মিথ্যাচার করতে পারে তারা যতই লেবাসধারী হোক তারা কখনো মুসলমান হতে পারে না! তারাই ইসলামের প্রকৃত শত্রু। ধর্ম ও জাতীয়তাবাদকে প্রতিপক্ষ হিসাবে দাড় করিয়ে ধর্মান্ধদের বিভ্রান্ত করার রাজনীতির অপসংস্কৃতি উপমহাদেশে অনেক আগে থেকেই চলে এসেছে! সুতরাং, আমি সঠিক জানবো,মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত না হয়ে যার যে জায়গা তাকে সে জায়গায় বসিয়ে সম্মান জানাবো,বিবেক ও যুক্তি তা ই বলে। আমাদের জাতীয়রতাবাদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এটা ই সর্বজনবিদিত হওয়া উচিত। তারপরও যদি ধর্মান্ধতা ও অন্ধবিশ্বাস না কাটে,বিশ্বাস টা মনে মনে রাখেন,যুক্তি তর্কে আইসেন না!

শাহরিয়ার শহীদ শুভ অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্মী,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

 

About gssnews2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*