চট্টগ্রাম   শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১  

শিরোনাম

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস 

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস 

জিএসএসনিউজ ডেস্ক :    |    ০১:৩২ পিএম, ২০২১-১১-১০

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস 

এম হাসান : রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই মৌলবাদ চরমবাদে এবং চরমবাদ জঙ্গিবাদে রূপ নিচ্ছে। নির্মম বাস্ততা হল, জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গিবাদের সম্ভাব্য উত্থান এই অঞ্চলের শান্তি নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সভ্যতার জন্য বড় আকারের হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে জঙ্গিবাদ বিস্তারের পরিধির তারতম্য থাকলেও এর পিছনে রাজনৈতিক ভূমিকা প্রায় একই। অপরাজনীতির কারণেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো সমাজে জঙ্গিবাদের শিকড় খুব গভীরে। উদাহরণস্বরূপ, এই দুটি দেশেই জঙ্গি গোষ্ঠী এবং তাদের সমর্থকরা জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখে।
বিশ্বে এখনও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানই জঙ্গি গোষ্ঠীর সবচেয়ে নিরাপদ আস্তাানা এবং এই দেশ দুটিই বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ‘রপ্তানি’ করে বেড়াচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জঙ্গি সংগঠনের অধিকাংশই পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান কেন্দ্রিক। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রাজনৈতিক সুবিধাবাদের জন্যই কিছু কিছু রাজনৈতিক দল আদর্শিক এবং সামাজিকভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে। 
তাই এ দেশেও এক সময় এই উগ্রবাদ জঙ্গিবাদে রূপ নিয়েছিল। সুন্নি জঙ্গি সংগঠন ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস) ইসলামিক খেলাফত ঘোষণার পর দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বেশ ঝুঁকিতে পড়ে যায়। একটি নিরব হুমকি রয়েছে এই অঞ্চলের প্রত্যেক দেশের জন্য। গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৫ ইং রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী এবং খিলক্ষেত থেকে ‘আইএস’এর চার সদস্যকে গোয়েন্দারা আটক করে। 
আটককৃতদের মধ্যে বাংলাদেশে দায়িত ¡প্রাপ্ত আইএসের প্রধানও রয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান- কেন্দ্রিক আল কায়েদা এবং তালেবানের বহু শীর্ষনেতা তালেবান নেতা মোল্লা ওমরকে বাদ দিয়ে আবু বকর আল বাগদাদিকে বিশ্বস্ত নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই আইএস তাদের সদস্য নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তান থেকেই বেশি সদস্য নিয়োগ করছে তারা।
বাংলাদেশের জঙ্গি রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কিছু উগ্র ধর্মীয় সংগঠন ১৯৮০ সাল থেকেই তাদের কর্মকান্ড প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে পরিচালনা করে আসছে। মোহাম্মদ আজিজুর রহমান এবং মোহাম্মদ বিন কাসেম ২০১১ সালে একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন যে, ‘আমরা ঢাকাবাসী’ ও ‘খাতুমে নবিয়াত আন্দোলন’ (এটি পাকিস্তানের অংশ) ১৯৮০ সালে থেকে পাকিস্তানের খাতুমে নবিয়াতের অর্থায়নে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে।
জেনারেল এরশাদের শাসনামলে কোনো শক্তিশালী উগ্রবাদী কার্যক্ষম লক্ষ্য করা যায়নি। এর পেছনে মোটা দাগে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে দেশীয় মুজাহিদিনরা আফগানিস্তানের মুজাহিদিনদের পক্ষে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। ফলে ১৯৮৯ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো ধরনের উগ্রবাদী কর্মকান্ড দেখা যায়নি।
দ্বিতীয় কারণটি হল, জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে অন্যান্য বিরোধী দলগুলি, এমনকি জামায়াতে ইসলামীও অভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করে আসছিল। বড় দুটি দলের মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় থাকায় ধর্মীয় উগ্রবাদ ততটা লক্ষ্য করা যায়নি।
প্রসঙ্গত, অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ‘ইনকিউবেশান পিরিয়ড’ বলে মনে করেন। রহমান এবং কাসেম তাদের সেই গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন যে, ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান এবং দেশে-বিদেশে তাদের নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসার ঘটে
২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সালের শেষ পর্যন্ত জঙ্গিবাদের ভয়াবহ রূপ বাংলাদেশ দেখেছে। বেড়ে গিয়েছিল যত্রতত্র বোমা হামলার ঘটনা। 
এসব বোমা হামলায় মারা গেছে অসংখ্য মানুষ। মূলত, মূলধারার রাজনীতি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে  ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল  পর্যন্ত যে সকল জঙ্গি সংগঠন অবাধে তাদের কার্যকলাপ পরিচালনা করেছিল, তাদের মধ্যে চারটি জঙ্গি গোষ্ঠী জনবল, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, সক্ষমতা ও দক্ষতার জন্য বেশি আলোচিত ছিল।
সেগুলো হল, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদুল ইসলামী ও হিজবুত তওহিদ। বাংলাদেশে জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, গবেষক ও পশ্চিমা দুনিয়ার আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা খুঁজতে থাকে বাংলাদেশ জঙ্গি গোষ্ঠীর নতুন আশ্রয়স্থল হওয়ার পিছনের কারণ এবং জঙ্গি গোষ্ঠীর কার্যক্ষমের পরিধির বিষয়ে।
বিশ্বব্যাপী এই জঙ্গিবাদের উত্থানের জন্য তৎকালীন বিএনপি-জামাত সরকারে জঙ্গিবান্ধব মনোভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহায়তাকেই দায়ী করা হয়। জঙ্গিদের আইনের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ থাকায় বিএনপি-জামাত জোট সরকার ২০০৫ সালের শেষের দিক দিয়ে কিছু ব্যবস্থা নেয়; কিছু জঙ্গি নেতার ফাঁসিও হয়েছিল তখন।
প্রথম আলো; ৩০ জানুয়ারি, ২০০৭ সালে প্রকাশিত  সংবাদে বলা হয়, বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য অনেকগুলি স্বতন্ত্র গবেষণা হয়েছে। রহমান ও কাসেমের গবেষণা (২০১১) অনুযায়ী, দেশে জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যা ৭০। ২০০৫ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ৩৩টি ইসলামি জঙ্গি সংগঠনকে শনাক্ত করেছিল। পরে, ২০০৯ সালে নিরাপত্তা এজেন্সিগুলোও ৩৩টি জঙ্গি সংগঠন রয়েছে বলে সরকারকে রিপোর্ট দিয়েছিল।
জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যা কম বেশি হয়। কারণ কৌশলগত কারণে ওদের চেহারা বদলায়, নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করে। রহমান ও কাসেমের গবেষণায় (২০১১) দেখা যায় যে, দেশে ১৮ জানুয়ারি, ১৯৯৯ থেকে ৪ নভেম্বর, ২০১০ পর্যন্ত প্রায় ১০০টি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বোমা হামলায় নিহত হয়েছে ১৩৬ জন, আহত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৮ জন।
এবার উল্লেখযোগ্য জঙ্গি হামলাগুলোর কথা পাঠকদের জানাতে চাই।
বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ যশোরে উদীচী শিল্প গোষ্ঠীর উপর প্রথম বোমা হামলা হয়। মারা যায় ১০ জন, আহত হয় ১০৬ জন।
একই বছরের অক্টোবরের ৮ তারিখে খুলনায় আহমদিয়াদের মসজিদে বোমা হামলায় মারা যায় আট জন, আহত হয় ৪০ জন।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিলে রমনা পার্কের বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ নিহত ও একশরও বেশি আহত হয়েছে।
২০০১ সালের শেষের দিকে, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বরে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সভায় জঙ্গিদের বোমা হামলায় ৮ এবং ৪ জন যথাক্রমে মারা যান। আহতের সংখ্যা শতাধিক।
২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরাতে শক্তিশালী দুটি বোমা হামলায় মারা যায় ৩ জন, আহতের সংখ্যা ছিল ১২৫এরও বেশি।
একই বছরের ৭ ডিসেম্বর সিরিয়াল বোমা হামলা চালানো হয় ময়মনসিংহের সিনেমা হলগুলিতে। মারা যায় ১৮ জন, আহত হয়েছিলেন ৩০০।
২০