চট্টগ্রাম   রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১  

শিরোনাম

ফুল-পাখিদের সকাল আর হ্রদ পাহাড়ের জীবনের গল্প

জিএসএসনিউজ ডেস্ক :    |    ০৭:১৭ পিএম, ২০২০-১০-০৭

ফুল-পাখিদের সকাল আর হ্রদ পাহাড়ের জীবনের গল্প

বিহারী চাকমাফুল আর পাখিদের সান্নিধ্যে সকালটা সুন্দর হয়েছিল শিশিরের। নানান প্রজাতির রঙ-বেরঙের সুন্দর মনোহর ফুলেরা তাকে একটি রঙিন সকাল উপহার দিল। মনুষ্যলোক দেবলোকে ফুলের নানান নাম হয়। যেমন কৃঞ্চচুড়া, নয়নতারা, পারিজাত কুসুম, সন্ধ্যামালতী, রক্তজবা, মাধবীলতা, গন্ধরাজ আরো কত কত নাম হয় ফুলদের। সব ফুলেরাই শিশিরের কাছে মনোহর, মনোরম, অতিপ্রিয়, পবিত্র সুন্দর। ফুলেদের রূপ, সৌন্দর্য্য, সৌরভ স্পর্শ করে মুগ্ধ হয় হৃদয় মন। ফুলগুলোর আলাদা নাম না হয়ে যদি কেবলবিউটিফুলহত তবে সেটাই যথার্থ হত তা মনে মনে ভাবে সে

করোনা ভাইরাসের ভয় একটু কেটে যাবার পর অনেকটা প্রস্তুতি ছাড়াই সুবলংয়ে চেয়ারম্যানের বাগানে বেড়াতে গিয়ে সেখানে রাত্রিযাপন করেছিল শিশির। পরিপাটি সাজানো গোছানো সুন্দর বাড়ি বাগানটায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে নানান কিছু কল্পনা করেছিল। স্বপ্নরাও ছুঁয়েছিল বেশ। খুব আরামের একটা ঘুম হয়েছিল। অনেক সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিল রাতের ঘুমে। পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই একঝাক পাখির সাথে দেখা হল উঠোনের ছোট ফুল বাগানটায়। প্রফুল্ল মনে ফুলের বাগান, পাখিদের গান, নিবিড় হ্রদের সুন্দর ছবি, প্রকৃতির রূপ দেখে দেখে বিমোহিত হল। দোয়েল, ফিঙে, কালোপাখি, শালিক, ‘আট্যারাদা’ (পাহাড়ে বিলুপ্তপ্রায় পাখি) বুলবুলিরা কখনো গাছের ডালে, কখনো মাটিতে কখনো আকাশে উড়ে উড়ে আপনমনে গান গেয়ে যাচ্ছিলো। কুঞ্জলতা, রক্তজবা, মুচন্দা মাধবীলতার সৌন্দর্য্য সর্বদা মানুষকে মুগ্ধ করে। শুভগুণে গুণান্বিত তুলসীগাছেরা বাগানবাড়ির সাঝির নীচে বেশ শোভাময়। একটু নাড়া দিলেই তুলসীর সুগন্ধ বেরোয়। এক অন্যরকম সৌরভ। মৃদুমন্দ হিমেল হাওয়ারা তুলসীপাতা, কুঞ্জলতা,রক্তজবা ফুলে গাছ-গাছালিতে আপন পরশ দিয়ে যায়। পাখির গান, ফুলের সুবাস, হিমেল হাওয়ার পরশে ¯িœগ্ধ সুরভিত সুন্দর সকালটায় মনটা বারে বারে ফিরে যায়। সুবলংয়ে পাখি আর ফুলেদের খুব করে মিস করতে হবে একদিন

সকালে নাস্তা খাবার পর চেয়ারম্যান সাহেবের বাগানবাড়ি থেকে সুবলং বাজার চলে এলো শিশির। উদ্দেশ্য সাপ্তাহিক হাট বাজারে লোকজন এলে তাদের সঙ্গে গ্রামে চলে যাবে

সুবলং বাজারে হাজারে হাজারে মানুষ। মানুষের ভীড়ে করোনা ভাইরাস টিকতে না পেরে বহুদুরে চলে গেছে। লজ্জায় শিশিরের ফেইস মাক্সগুলো ব্যাগের ভেতর কিংবা প্যান্টের পকেটে ঢুকে পড়ে। করোনা ভাইরাস নিয়ে সরকারের নির্দেশনাগুলো এখানে একেবারে নিরীহ, অসহায় নিরূপায় হয়ে বসে থাকে

সুবলং বাজারে ঘুরতে লাগল শিশির। পরিচিত বেশকিছু মানুষের সঙ্গেও দেখা হল। যে বন্ধুদের সঙ্গে একসময় সে সুবলং বাজারে কাটিয়েছিল তারা এখন কেউ নেই। হঠাৎ এক ধরণের শূন্যতা অনুভব করতে লাগল। বাজারের এমাথা থেকে ওমাথা ঘুরে ঘুরে বন্ধুদের স্মৃতিগুলোকে মনে জাগিয়ে তোলে। মফিজুর রহমান তালতোর দোকানের সামনে গিয়ে জীবনে প্রথম ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া বইটির প্রচ্ছদটা চোখে ভাসতে লাগল। বইয়ের ভেতর থেকে কয়েক লাইন লেখা মনে করতে অনেক চেষ্টা করেও কিছুই মনে পড়ছিল না। শুধু বইটির নাম মনে পড়লবিদায় বেলায়

অনেক চেষ্টায় লেখকের নাম স্মরণে এল- কাশেম বিন আবু বকর। শিশির প্রেমিকার কাছ থেকে প্রথম প্রেমের বই উপহার পেয়েছিল কাশেম বিন আবু বকরের লেখাবিদায় বেলায়বইটি। বেশ নস্টালজিক হয়ে পড়ছিল সে

তার আরও মনে পড়ল সুবলং বাজারেই সে প্রথম তার এসএসসি পাশের খবরটা পেয়েছিল। হাইস্কুলের মাস্টার মশাইয়েরা বরকল থেকে পরীক্ষা পাশের খবর এনে মানিক সাহার দোকানের পেছনের জায়গায় শিক্ষার্থীদের জড়ো করে রেজাল্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন এভাবে- রূপন চাকমা পাশ-সেকেন্ড ডিভিশন, জীবন চাকমা ফেইল, মনিষা চাকমা পাশ- ফার্স্ট ডিভিশন, শিশির চাকমা পাশ- সেকেন্ড ভিভিশন

সে বছর নিজে পাশ করলেও প্রিয়বন্ধু সহপাঠী জীবন চাকমার ফেইল চোখের জলে অনেক কষ্ট হয়েছিল শিশিরের। সেই বহুদিন আগে জীবনের চোখের জল আবার তার চোখে ভেসে উঠল। নিজের অজান্তেই আবারো অশ্রু ঝরল শিশিরের চোখে। জীবনের কথা ভাবতে লাগল। তবে পরের বছর ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে জীবনও এসএসসি পাশ করেছিল। রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে পরে দুজনেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। জীবনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে শিশিরের

চলতে চলতে সুবলং বাজারের পশ্চিম দিকে আর্মি ক্যাম্পের রাস্তায় পৌঁছলে সেখান থেকে ফিরতে লাগল শিশির। ফিরতে ফিরতে কাকার কথা মনে পড়ল। শিশিরের কাকা নির্মল চাকমা ধার্মিক মানুষ। নির্মল কাকা রাজবন বিহারস